ইজতেমার জুমায় এত মুসল্লি আগে দেখেনি কেউ

প্রকাশিত: ৯:১১ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১০, ২০২০

গাজীপুরের টঙ্গীতে ৬৪ জেলার ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের অংশ গ্রহণে কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থায় শুরু হয়েছে বিশ্ব ইজতেমার মূল আনুষ্ঠানিকতা। বাদ ফজর আম বয়ান পেশ করেন পাকিস্তানের মাওলানা খোরশেদ আলম। বাংলায় তরজমা করেন মাওলানা আব্দুল মতিন। দুপুরে অনুষ্ঠিত হয় বৃহত্তম জুম্মার নামাজ। নামাজে অংশ নিতে সকাল থেকেই মুসল্লিদের ঢল নামে তুরাগ তীরে।

স্মরণকালের ভেতর এবার অধিক মুসল্লির উপস্থিতির কারণে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমার জুমার জামাত পরিচালিত হয়েছে উত্তরা থেকে। বৃহত্তর এ জুমার জামাতে শরিক হতে সকাল থেকেই ঢাকা, টঙ্গী, গাজীপুর ও আশপাশের এলাকা থেকে মুসল্লিরা ইজতেমা অভিমুখী আসতে থাকেন। দুপুর সাড়ে ১২টার মধ্যেই মূল ময়দান উপচে জুমার জামাতের পরিসর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ময়দানের পূর্বে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, পশ্চিমে টঙ্গী-আশুলিয়া সড়কসহ আশপাশের সব সড়ক মহাসড়কের ওপর মুসল্লিরা জায়নামাজ,পাটি, খবরের কাগজ বিছিয়ে জামাতে দাঁড়িয়ে যান। এতে এক পর্যায়ে বেলা ১টার মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ইজতেমা ময়দানের পশ্চিম পাশে তুরাগ নদের পন্টুন ব্রিজ ও নৌকাতেও জামাত দাঁড়িয়ে যায়। এভাবে জামাতের পরিসর তুরাগ নদ অতিক্রম করে টঙ্গী-আশুলিয়া সড়ক ছাপিয়ে যায়।

উদ্ভুত পরিস্থিতিতে তাবলিগ জামাতের আলমে শুরা আশুলিয়া সড়কের পশ্চিম পাশে উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরে ইমামের মিম্বর স্থানান্তর করেন। অবশেষে ১০ নম্বর সেক্টরে বেলাল মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় স্থাপিত অস্থায়ী বিশেষ মিম্বর থেকে জুমার জামাতের ইমামতি করা হয়। টঙ্গীর মূল ময়দান থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূর থেকে এ সুবিশাল জুমার জামাতের ইমামতি করেন কাকরাইল মারকাজ মসজিদের খতিব মাওলানা জোবায়ের হাসান। তুরাগ নদে সেনাবাহিনীর স্থাপিত অস্থায়ী ভাসমান সেতু ও রাস্তায় দাঁড়িয়ে মুসল্লিরা ইমামের সাথে মূল ময়দানের সংযোগ স্থাপন করেন। সে হিসেবে এবার অধিক মুসল্লির উপস্থিতির কারণে ইজতেমা ময়দান ও তৎসংলগ্ন প্রায় চার বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে জলে-স্থলে জুমার জামাত অনুষ্ঠিত হয়।

অনেকে মূল ময়দানে জায়গা না পেয়ে আশপাশের রাস্তা ঘাট, ফুটপাত খালি জায়গা, ভবনের ছাদসহ বিভিন্নস্থানে বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তভাবে জুমার জামাতে শরিক হন। চোখের দৃষ্টি যতদূর যায় ততদূর পর্যন্ত শুধু মুসল্লিদের সারি। একপর্যায়ে বেলা পৌনে ২টায় জুমার জামাত শুরু হলে গোটা এলাকায় পিনপতন নিরবতা নেমে আসে।

আগামী রবিবার আখেরি মোনাজাতের মধ্যদিয়ে শেষ হবে ৫৫তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। আগামী ১৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে সাদ পন্থিদের ২য় পর্বের বিশ্ব ইজতেমা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, দেশ-বিদেশের লাখো ধর্মপ্রাণ মুসলমানের ইবাদত বন্দেগি, জিকির আজকার আর আল্লাহু আকবর ধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠেছে টঙ্গীর তুরাগ পাড়ের বিশ্ব ইজতেমা ময়দান। উত্তরের হিমেল হাওয়া আর কনকনে শীত উপেক্ষা করে লাখো মুসল্লি বয়ান, তাশকিল, তাসবিহ-তাহলিলে কাটাচ্ছেন। শীতের তীব্রতায় কারণে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া নির্ধারিত খিত্তার বাইরে যাচ্ছেন না মুসুল্লিরা। প্রচণ্ড শীত আর কয়েকদিন ধরে টানা শৈত্য প্রবাহ ও কুয়াশায় দুর্ভোগে পড়েছেন অনেক মুসুল্লি। এরই মধ্যে কেউ কেউ ঠান্ডাজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেক বয়স্ক ব্যক্তি এখানে সমবেত হওয়ায় তাদের দুর্ভোগ বেড়েছে বেশি। সর্দি, কাশি, জ¦র, নিউমোনিয়া, হাঁপানি, ডায়রিয়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন তারা। তবে ধর্মীয় এ সমাবেশে অংশ গ্রহণে শীতের প্রকোপ ও রোগের ভয় কোনো বাধা বলে মনে করেন না মুসুল্লিরা।

নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা: দেশ বিদেশের আগত মুসল্লিদের জানমাল রক্ষায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বিপুল সংখ্যক পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব কাজ করছে। এ ব্যাপারে র‌্যাব-১ এর পোড়াবাড়ি ক্যাম্প কমান্ডার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, ইজতেমা ময়দানের নিরাপত্তায় নেয়া হয়েছে ৫স্তরের নিরাপত্তা বলয়। পোশাকে, সাদা পোশাকে আইন শৃংখলা বাহিনী কাজ করছে। ইজতেমা ময়দান ও এর আশপাশের এলাকায় স্থল, জল এবং আকাশপথে ত্রিমাত্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সাদা পোশাকে র‌্যাব সদস্যরা ময়দানের ভেতরে ও বাইরে দায়িত্ব পালন করছে। বিশেষ করে বিদেশ থেকে আগত মুসল্লিদের জন্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে র‌্যাবের আভিযানিক কার্যক্রমসহ বিভিন্ন টহল কার্যক্রম বৃদ্ধি করা হয়েছে। ইজতেমায় আগত পরিবহনগুলো বিশেষ নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। ইজতেমা ময়দানের আশপাশে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোষ্ট স্থাপন করা হয়েছে। যেকোন উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিপুল পরিমান র‌্যাব সদস্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। র‌্যাবের রিজার্ভ জনবল স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবেও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়াও বোম্ব ডিস্পোজাল ইউনিট প্রস্তুত রাখা হয়েছে। র‌্যাবের পক্ষ থেকে ইজতেমা ময়দানে আগত মুসল্লিদের চিকিৎসা দেয়ার জন্য একটি কেন্দ্র খোলা হয়েছে। কেন্দ্রটিতে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক ও পর্যাপ্ত ওষুধ নিশ্চিত করা হয়েছে।

ইজতেমায় ৪ জনের মৃত্যু:  বৃহস্পতিবার রাতে টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমায় খোকা মিয়া (৬০) নামে একজন মুসল্লি মারা গেছেন। নিহতের বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলার কাজীপুর থানার পাটা গ্রামে। তিনি ময়দানে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে রাত ১০টায় টঙ্গী সরকারি হাসপালে নেয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত বলে ঘোষণা দেন। চট্টগ্রামের পটিয়া থানার খৈ গ্রামের বৃদ্ধ মুহাম্মদ আলী (৭০) এবং নওগাঁ জেলার আত্রাই থানার পাইকার বড় বাড়ি গ্রামের শহীদুল ইসলাম (৫৫) বৃহস্পতিবার রাতে ইজতেমায় মারা যান। এর আগে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় ইজতেমা ময়দানের নির্ধারিত খেত্তায় যাওয়ার সময় আকষ্কিক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইয়াকুব শিকদার (৭৫) নামের একজন তাবলিগ সাথী মারা যান। তার বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালি পাড়া উপজেলার লাখির পাড় গ্রামে।

নওগাঁ জেলা সদরের খলিলুর রহমান নামের অপর মুসল্লি ইজতেমা ময়দানে স্টোক করলে তাকে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টায় টঙ্গী হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এদিকে ইজতেমায় দায়িত্ব পালনরত যাত্রাবাড়ি থানার এসআই ওসমান আলী (৩৫) বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জ্ঞান হারিয়ে ফেললে তাকে টঙ্গী সরকারি হাসপাতাল থেকে রাজারবাগ পুলিশ লাইন হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে তাবলিগ সাথি: বৃহস্পতিবার রাতে টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমায় দুই জন মুসল্লি অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়ে সর্বস্ব খুইয়েছেন। তারা হলেন আমির হোসেন (৪৫) ও আলমগীর হোসেন (৫৫)। আমির হোসেনের বাড়ি ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার কুল কাইচ্ছা গ্রামে এবং আলমগীরের বাড়ি একই উপজেলার ছাগলা গ্রামে। তারা জামাতবন্দি হয়ে ইজতেমা ময়দানের ৪৮ নম্বর খিত্তার ৪৪০ নম্বর খুঁটিতে অবস্থান করছিলেন। তাদের একজন সাথি নাগর মিয়া জানান, ময়দানের পাশে ভাসমান দোকান থেকে চিড়া কিনে খাওয়ার পর তারা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

দ্বিতীয় পর্ব: প্রথম পর্বের পর চারদিন বিরতি দিয়ে আগামী ১৭ জানুয়ারি শুরু হবে দ্বিতীয় পর্ব। পরে একইভাবে ১৯ জানুয়ারি আখেরী মোনাজাতের মধ্যে দিয়ে শেষ হবে এবারের বিশ্ব ইজতেমা। প্রথম পর্বের ইজতেমা পরিচালনা করছেন জোবায়ের পন্থিরা এবং দ্বিতীয় পর্ব পরিচালনা করবেন সাদ পন্থিরা। বিশ্ব ইজতেমার দুই পর্বেই দেশের ৬৪ জেলার মুসুল্লি অংশ নিতে পারবেন।