ঈশ্বরগঞ্জে যৌতুকের জন্য গৃহবধুকে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা

গৌরীপুর নিউজ
প্রকাশিত : শনিবার ৮ জুন, ২০১৯ /

চাহিদা মতো সত্তুর হাজার টাকা যৌতুক না দেওয়ায় স্বামী-শ্বাশুড়ি ও দেবর মিলে ঘরের দরজা বন্ধ করে শরীরে কেরোসিন ঢেলে গৃহধূর শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। একপর্যায়ে আশংকাজনক অবস্থায় যখন নানী শ্বাশুড়ি তাঁকে উদ্ধার করে তখন শরীরের অধিকাংশ ঝলসে গেছে।

এ অবস্থায় পাঁচ দিন রেখে দেওয়া হয় শিরিনা আক্তার নামের ওই নারীকে। তাঁকে জরুরি চিকিৎসা না দিয়ে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবশেষে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় দিনমজুর বাবা আশঙ্কাজনক অবস্থায় মেয়েকে উদ্ধার করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করেন। কর্তব্যরত চিকিৎসক জানিয়েছেন, শরীরের প্রায় সত্তুরভাগ পুড়ে গেছে তাঁর। এ ঘটনায় পাঁচজনকে আসামি, করে গতকাল শুক্রবার রাত দশটার দিকে মামলা দায়ের করা হয়েছে ঈশ্বরগঞ্জ থানায়।

মামলার আসামিরা হচ্ছেন- স্বামী শরীফ মিয়া (২৮), শ্বশুর শাহাবুদ্দিন (৬০), শ্বাশুড়ি হাসিনা বেগম (৫৫), দেবর মিজান (২২) ও গ্রামের হোমিও চিকিৎসক ফারুক (৩৫)। এদের মধ্যে শ্বাশুড়ি হাসিনা বেগম, দেবর মিজান ও হোমিও চিকিৎসক ফারুককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি দুই আসামিকেও মোবাইল ফোন ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে শুক্রবার রাতেই গ্রেপ্তার করা সম্ভব বলে জানান স্থানীয় রায়েরবাজার পুলিশ তদন্ত কেন্দে র ইনচার্জ ইন্সপেক্টর (পরিদর্শক) আবদুল মোতালিব চৌধুরী।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শিরিনা আক্তার (২২) উপজেলার মাইজবাগ ইউনিয়নের পূর্ব কুমারুলী গোয়ালপাড়া গ্রামের আবদুল হাইয়ের মেয়ে।

গতকাল শুক্রবার আবদুল হাই সাংবাদিকদের জানান, গত বাংলা বছরের কার্তিক মাসে পাশের মাছিমপুর গ্রামের শাহাব উদ্দিনের পুত্র শরীফ মিয়ার (২৮) সাথে শিরিনার বিয়ে দেন। বিয়ের সময় যৌতুক বাবদ জামাইকে ৭৫ হাজার টাকা ও অন্যান্য তৈজসপত্র দিয়েছেন। কিন্তু আরো টাকা ও জিনিসপত্র দেওয়ার জন্য তাঁর মেয়েকে মারধর করতো জামাই শরীফ।
এ অবস্থায় ২১ রমজানের সময় প্রয়োজনীয় ইফতারসহ স্ত্রীকে সাথে নিয়ে মেয়ের শ্বশুড়বাড়িতে যান আব্দুল হাই। কিন্তু ইফতারের সাথে চাহিদা মতো যৌতুকের টাকা না নিয়ে যাওয়ায় ক্ষিপ্ত হন মেয়ের শ্বশুড়-শাশুড়ি ও জামাই। এ সময় ইফতার ফেলে দিয়ে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে তাড়িয়ে দেওয়া হয় তাঁকে। এ অবস্থায় গত ১ জুন সকালে মেয়েকে ফের টাকার জন্য তাগাদা দেয় শ্বশুরবাড়ির লোকজন। মেয়ে ফোন করে তাদের জানায় যে তাকে অত্যাচার করছে তারা। এরপর বেশ কয়েকদিন মেয়ের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের খবর পাচ্ছিলেন না। পরে জানতে পারেন মেয়ের শ্বশুর বাড়ির লোকজন শিরিনার শরীরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে কয়েকদিন আগে। কিন্তু তাদের কাউকে এ ঘটনাটি জানানো হয়নি। একপর্যায়ে তিনি শিরিনার নানী শাশুড়ির মাধ্যমে গত ৩ জুন ঘটনাটি জানতে পারেন। পরে তিনি আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে নিয়ে এলাকাবাসীর সহায়তায় মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে যান। গিয়ে দেখতে পান গুরুতর আহত শিরিনাকে কলাপাতায় শুইয়ে রাখা হয়েছে। জানতে চাইলে শাশুড়ি বলেন, মেয়ে নিজেই শরীরে আগুন ধরিয়ে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল। এই অবস্থায় তিনি মেয়েকে নিয়ে আসতে চাইলে মেয়ের শাশুড়ি হাছিনা খাতুন ও জামাই শরীফ মিয়া দেবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন। পরে এলাকা থেকে আরো লোকজনকে নিয়ে চাপ প্রয়োগ করে মেয়েকে বাড়ি নিয়ে আসেন। পরে গত বৃহস্পতিবার তাঁকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেন।

গৃহবধূর শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগের সত্যতা জানার জন্য গতকাল শুক্রবার ঈশ্বরগঞ্জের রায়েরবাজার তদন্তকেন্দে যোগাযোগ করা হয়। তদন্ত কেন্দে র ইনচার্জ ইন্সপেক্টর (পরিদর্শক) আবদুল মোতালিব চৌধুরী বিষয়টি জানেন না বলে জানান। পরে তিনি তৎপর হয়ে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে ঘটনার সত্যতা পান।

গতকাল শুক্রবার মাছিমপুর গ্রামে শরীফের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। শিরিনার শরীরে আগুন দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে শাশুড়ি হাছিনা খাতুন বলেন, সে (শিরিনা) নিজেই নিজের শরীরে আগুন দিয়েছে। একজন মানুষ শুধু শুধু কেন নিজের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেবে জানতে চাইলে তিনি আর কিছু বলতে রাজী হননি। এ সময় পুলিশের একটি দল হাছিনা খাতুন ও তাঁর আরেক ছেলে মিজানকে ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য রায়ের বাজার পুলিশ তদন্ত কেন্দে নিয়ে যায়।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিরিনার সাথে রয়েছেন তাঁর ছোটভাই ফারুক মিয়া। ফারুকের মুঠোফোনের সহায়তায় শিরিনার কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, শাশুড়ির সহযোগিতায় স্বামী শরীফ মিয়া তাঁর শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে দরজা আটকে দেন। এ সময় তিনি চিত্কার করলেও তাঁকে বাঁচাতে কেউ এগিয়ে আসেনি। শিরিনা বলেন, ‘আমি কথা কইতে পারছিনা। মনে অয় এইডাই আমার শেষ কথা। আপনেরা এইডারে (স্বামী) ধরেন, বিচার করেন। ’

রায়েরবাজার তদন্ত কেন্দে র ইনচার্জ ইন্সপেক্টর (পরিদর্শক) আবদুল মোতালিব চৌধুরী বলেন, শিরিনার জবানবন্দি গ্রহণের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন উপপরিদর্শককে পাঠানো হয়েছে।

ময়মনসিংহ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাখের আহম্মেদ সিদ্দিকী জানান, ঘটনার খবর পেয়ে তিনি শিরিনাকে দেখতে মমেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে গিয়েছেন। শিরিনার স্বামীকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

এদিকে গতকাল শুক্রবার রাত ১০টায় পাওয়া সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, অবস্থা আশংকাজনক হওয়ায় শিরিনাকে ঢাকায় রেফার করেছে মমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু টাকার অভাবে তাকে ঢাকায় আনতে পারছেন না তাঁর বাবা। তবে পুলিশ সুপারের উদ্যোগে তাঁকে ঢাকায় নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে। এছাড়া তদন্ত কেন্দ্রের উপপরিদর্শক জিয়াউর রহমান ভিক্টিম শিরিনা আক্তারের জবানবন্দি গ্রহণ করেছেন। সূত্র- কালেরকন্ঠ

আপনার মতামত লিখুন :