একজন আজন্ম মাষ্টার অধ্যাপক যতীন সরকার

হরিদাস ঠাকুর
প্রকাশিত : বুধবার ১৮ আগস্ট, ২০২১ /

‘আমার প্রথম ও প্রধান পরিচয় আমি মাষ্টার। আমি মাষ্টার হতে চেয়েছি। মাষ্টার হয়েছি। মাষ্টারি ছাড়া আমি আর কিছুই করতে চাইনি। আমার বক্তৃতা কিংবা লেখালেখি-এসবই মাষ্টারির অংশ’- যিনি এ কথঅগুলো দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন ও বলেন, তিনি আমার সর্বজন শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক যতীন সরকার। তিনি একাধারে দেশের অগ্রগণ্য আদর্শনিষ্ঠ শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, সাম্যবাদী তাত্ত্বিক।
আজ ১৮ আগস্ট অধ্যাপক যতীন সরকারের ৮৬তম জন্মদিবস। অধ্যাপক যতীন সরকার আমার নিকট প্রতিভাত হন একজন আদর্শ অভিভাবক-পথপ্রদর্শক হিসেবে। তিনি আমার এবং অনেকের কাছেই একজন সুশীতল ছায়াপ্রদানকারী বটবৃক্ষ সমতুল্য। তাঁর জন্মদিনে আমার-আমার পরিবার ও তাঁর সৃজিত বৃহত্তর জ্ঞান পরিবারের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি ও বিনম্র প্রণতি জানাই।
প্রাণরসে টইটুম্বুর হাস্যোজ্জ্বল প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্ব যতীন সরকারের জন্ম ১৮ আগস্ট ১৯৩৬ খ্রি.; ০২ ভাদ্র ১৩৪৩ বঙ্গাব্দ তৎকালীন বৃটিশ ভারতের ময়মনসিংহ জেলার নেত্রকোণা মহকুমার (বর্তমান বাংলাদেশের নেত্রকোণা জেলা) কেন্দুয়া উপজেলার চন্দপাড়া গ্রামে। বাবা জ্ঞানেন্দ্র সরকার তাঁর শতায়ু পরমায়ু দিয়ে জ্ঞানের বাতাররণ সৃষ্টি করেছিলেন যতীনের মাঝে। মা বিমলা সরকার বিমলানন্দে প্রয়াত হয়েও ধন্যা হয়েছেন কৃতি ছেলের জন্য। পিতামাতার তিন সন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ সন্তান তিনি। দুভাই ও একবোন এর সংসারে বাল্যকাল কেটেছে আনন্দে ও গ্রাম্য পরিবেশের মাধুর্য্যে। রামপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়,চন্দ্রনাথ হাইস্কুল, বেখৈরহাটি, আশুজিয়া হাইস্কুল মহাভারতের দ্রোণের মতোই ধারণ করে সার্থক হয়েছে নেত্রকোাণা কলেজ, আনন্দমোহন কলেজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কিছুটা গর্ব করতেই পারে তাদের এই জ্ঞানব্রতী কৃতিমান ছাত্রের জন্য। কিছুদিন স্কুলশিক্ষকতা করেছিলেন। আগস্ট মাস তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে একজন মর্ম ধারণকারী দার্শনিক হিসেবে। জ্ঞান অরণ্যের সুকুমার ফলটি পাবার জন্য তিনি উচ্চতর বিদ্যাগ্রহণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে পান বাংলা সাহিত্যের নন্দিত প-িত ড. এনামূল হককে। এখানেই প্রত্যক্ষ করলেন ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। কেঁপে উঠলো তাঁর মন। বিদ্রোহ করলেন। এ সময়কার দানবের অমানবীয় অপকর্ম দর্শন করেই হয়তো তিনি লালনের-নজরুলের-জালাল খাঁর ভাবশিষ্য হয়ে মানবতার- শোষিত মানুষের মুক্তির দর্শনেও দীক্ষা গ্রহণ করলেন।
১৯৬৭ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। স্ত্রীর নাম কানন সরকার। দু’সন্তানের জনক জননী। ছেলে সুমন সরকার স্লোভাকিয়া প্রবাসী এবং মেয়ে সুদীপ্তা সরকার সরকারী চাকুরী করেন ( যুগ্ম জর্জ )। শিশুক সরকার, মার্টিন সরকার, টমাস সরকার ও অমিয়া সরকার তাঁর চারজন আদরের নাতি।
যতীন সরকার ১৯৬৪ সালে ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজে এলেন বিদ্যাদানের নিমিত্তে। বাংলাভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপনা করেছেন এখানে। ২০০২ সাল পর্যন্ত নিরবিচ্ছিন্ন ৩৮ বছর কাটিয়ে দিলেন শিক্ষকতার মহান ব্রতে নিজেকে উজার করে। অতঃপর বহুনামাবলী গায়ে দিয়ে ময়মনসিংহকে পুলকিত করে বহুজনকে বিভূষিত করে তিনি তাঁর জীবনের ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ কাটিয়ে ‘বাণপ্রস্থ’ জীবনের অন্তিম পর্ব নেত্রকোণায় ভাসিয়ে দিলেন। উল্লেখ্য যে, যতীন সরকারের গৃহের নাম ‘বাণপ্রস্থ’।
সেই পঞ্চাশের দশকেই কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে পরিচিত হন যতীন সরকারএবং আনন্দ মোহন কলেজে থাকাকালীন দীক্ষা গ্রহণ করেন। এই জন্যই তিনি শোষিত মানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রামে শামিল হন। এই সংশ্লিষ্টতার জন্য তিনি একবার কারাগারে আটক ও ছিলেন। তিনি পার্টি র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যও ছিলেন।
যতীন স্যার একজন আদর্শ শিক্ষক-আদর্শ মানুষ-আদর্শ চিন্তক। তিনি নিজে যেমন চিন্তা করেন, ভাবেন; অন্যকেও চিন্তা করতে বাধ্য করেন-অন্যের ভাবনার বাতায়ন মুক্ত করে দেন। স্বভাবজাত কারণে ও গুণেই তিনি সকলের আপনজন; কারো কাছে ‘যতীন দা’; কারো কাছে ‘যতীন স্যার’-‘যতীন বাবু’। আদর্শের আপোষহীনতায় তিনি আপোষহীন। তাঁর চারিত্রিক সকল বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে তাঁর একান্ত আপনজন ‘জলদ’ সম্পাদক স্বপন ধর যথার্থ বলেছেন- ‘দৃঢ়চেতনায় তিনি ‘বাঘা যতীন’, কাগ্মীতে ‘কেশব সেন’, পান্ডিত্যে ‘বিদ্যাসাগর’, দীক্ষাদানে ‘বৃহস্পতি’, উপদেশে ‘চাণক্য’, রসবোধে ‘বীরবল’।
Dr. Samuel Johnson বলেছেন ‘The next best thing to knowing something is knowing where to find it’. যতীন স্যার এখানেই বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। জ্ঞান আমাদের মনের দরজা খুলে দেয়-আমাদের গন্তব্যের সন্ধান দেয়। আমাদের জ্ঞানের দরজা উন্মোচিত হলে- প্রসারিত হয় আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। যতীন স্যার এখানেই অনন্যসাধারণ। তিনি শুধু জ্ঞান বিতরণই করেন না বরং ছাত্রদের ( অছাত্রদেরও) আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে গড়ে তোলেন এক একজন জ্ঞানসাধক হিসেবে। এর প্রমাণ পাওয়া যাবে দেশের সরকারী ও বেসরকারী গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে ও প্রতিষ্ঠানে তাঁর ছাত্রদের (তাঁর সরাসরি ছাত্র না হয়েও) দীপ্ত পদচারণায়। তিনি জ্ঞান বিতরণে বিশেষভাবে বিশেষজ্ঞ কারণ তিনি জ্ঞানের অফুরন্ত ভা-ার। তিনি কী জানেন না এটাই বোধহয় আমাদের বিস্ময়ের বিষয় হতে পারে। রুশ উদ্ভিদবিদ তিমিয়ারেজভ যেমন একজন জ্ঞানী লোকের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন-‘ A wise man is he who knows something about everything and everything about something. আমাদের যতীন স্যারের ক্ষেত্রে একজন যথার্থ জ্ঞানী ব্যক্তির উপরোক্ত সংজ্ঞা এক বাক্যে শতভাগ সত্য এটা বলতে বা স্বীকার করতে বোধহয় কারোরই আপত্তি থাকবে না। তিনি ছাত্রদের জ্ঞানচক্ষুর দরজা জানালা খুলে দেন যাতে তারা নিজেরাই আলোর সঠিক পথ খুঁজে পেতে পারেন। যতীন স্যার যেন আমাদের এমানুয়েল কান্ট এর কথাই স্মরণ করিয়ে দেন-‘ You will come to me not for knowledge but how to know; not for philosophy but how to philosophies.’ স্যার আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে জ্ঞানের রাজ্যে নিজেকে অভিষিক্ত করতে হয়-কীভাবে নিজের মনোরাজ্যে একটি দার্শনিক সত্ত্বার স্ফুরণ ঘটাতে হয়-কীভাবে বিশ্বমানব হওয়ার পথে কায়মনবাক্যে বাঙালি হতে হয়-মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শকে কীভাবে ধারণ ও লালন করতে হয়-কীভাবে হতে হয় অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী ।
সব মিলিয়ে যতীন সরকার একজন জ্ঞানালোক পিয়াসী পব্রিাজক যার মূলমন্ত্র হলো ‘চরৈবেতি’ বা ‘এগিয়ে চলো’। এই এগিলে চলার পথে তিনি টেনিসনের মতোই আজীবন বলে এসেছেন-
I am an infant crying in the night,
I am infant crying for light.
And with no language but a cry.
বুদ্ধিজীবী,গবেষক, প্রাবন্ধিক, বাংলাদেশের জন্মবৃত্তান্ত কথক, প্রখ্যাত মার্ক্সীয় তাত্ত্বিক ও মানবতাবাদী নিবেদিত প্রাণ যতীন সরকার একজন দক্ষ সংগঠকও । উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সভাপতি ছিলেন দুমেয়াদে। সচেতন নাগরিক সমাজের একজন সদস্য তিনি। ‘সমাজ, অর্থনীীত ও রাষ্ট্র’ নামক একটি ত্রৈমাসিক তত্ত্বমূলক পত্রিকার সম্পাদকও ছিলেন। প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ‘সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা’(১৯৮৫)। এরপর একে একে প্রকাশিত হয় ‘বাংলাদেশের কবিগান’, ‘বাঙালির সমাজতন্ত্রিক ঐতিহ্য’, ‘সংস্কৃতির সংগ্রাম’, ‘ মানবমন মানবধর্ম ও সমাজবিপ্লব’, ‘গল্পে গল্পে ব্যাকরণ’,‘ দ্বিজাতিতত্ত্ব, নিয়তিবাদ ও বিজ্ঞানচেতনা’,‘ সংস্কৃতি ও বুদ্ধিজীবী সমাচার’, ‘আমাদের চিন্তাচর্চার দিকদিগন্ত’, ‘ধর্মতন্ত্রী মৌলবাদের ভূত ভবিষ্যৎ’, ‘ ভাষা সংস্কৃতি উৎসব নিয়ে চিন্তাচেতনা’,‘ প্রাকৃতজনের জীবনদর্শন’, ‘ সত্য যে কঠিন’, ‘আমার রবীন্দ্র অবলোকন’, ‘ বিনষ্ট রাজনীতি ও সংস্কৃতি’ ও চারটি জীবনীগ্রন্থসহ অসংখ্য প্রবন্ধ সংকলন ও গবেষণামূলক গ্রন্থ। সম্পাদিত গ্রন্থের মধ্যে আছে- রবীন্দ্রনাথের সোনার তরী, ‘প্রসঙ্গ: মৌলবাদ’, ‘জালালগীতিকা সমগ্র’। প্রকাশের অপেক্ষায় আছে আরো বেশ কয়েকটি বই।
১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ যতীন সরকারের মনোজগতের উথালপাথাল পরিব্রাজনা। ৪৭ থেকে ৭১ আমাদের জাতীয় জীবনের এক অনবদ্য ইতিহাস। এর প্রেক্ষিতেই বাংলাদেশের রক্তাক্ত যন্ত্রণাময় জন্মগ্রহণকে একজন নির্মোহ দর্শকের দৃষ্টিতে অসাধারণ শৈল্পিক আদরে ও ভালবাসায় তিনি রচনা করেছেন ‘পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু দর্শন’ নামের অসাধারণ বই। এটি ১৪১১ সালে ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা বই’ এর পুরস্কারে সম্মানিত। এরই ধারাবাহিক গ্রন্থ ‘পাকিস্তানের ভূত দর্শন’ নামক আর একটি অসামান্য গ্রন্থ।
১৯৬৭ সালে বাংলা একাডেমী থেকে ‘ডক্টর এনামূল হক স্বর্ণপদক’ পান। ‘খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার’, ‘মনিররুদ্দীন ইউসুফ সাহিত্য পুরস্কার’, নারায়ণগঞ্জের ‘শ্রুতি পদক’, ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবের ‘রবীন্দ্র সম্মেলন পুরস্কার’ সাহিত্য পুরস্কার’ পেয়েছেন। সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ‘স্বাধীনতা পুরস্কার (২০১০)’ ও ‘বাংলা একাডেমী পুরস্কার (২০০৮)’ অর্জন করেছেন তিনি।
একজন আদর্শ সংস্কৃতিসেবী অধ্যাপক যতীন সরকার। সারাজীবনের কর্ম ও সাধনার মাধ্যমে তিনি সংস্কৃতির মূল সূত্র আয়ত্ত্ব করে সকলের মাঝে ছড়িয়ে দেবার ব্রতে ব্রতী ছিলেন। তিনি ইটালীর দার্শনিক লুকাচের আপ্তবাক্যকে জীবনের সার মনে করেছিলেন-‘সংস্কুতি হচ্ছে মূল লক্ষ্য, রাজনীতি সে লক্ষ্যসাধনের একটি উপায় মাত্র।’ সহজ সরল জীবনাচারে যতীন স্যার একজন বিদগ্ধ রসিক জন। মোবাইলের অত্যাচারকে তিনি বলেন ‘যন্ত্রের যন্ত্রণা।’ অতি পন্ডিতদের লক্ষ্য করে বলেন-‘যার সবকিছু পন্ড হয়েছে তিনিই পন্ডিত।’ আর দার্শনিক হেলভেশিয়াস এর সরস উক্তি দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করেন গন্ডমূর্খ বলে-‘ Man is born ignorant, he made stupid by education.’
৭১ এর উত্তাল সময়ে প্রাণ বাঁচানোর দৌঁড়ে ক্লান্ত হয়ে যতীন স্যারের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে জীবনধর্মী আপ্তবাক্য-‘শোন, আমরা যে জিনিসটি রক্ষা করার জন্য দৌঁড়াচ্ছি, সেই জিনিসটিইতো বের হয়ে যাচ্ছে। তবে দৌঁড়ে আর লাভ কী?’
যতীন সরকার ইতিহাস লেখক না হয়েও হয়েছেন ইতিহাসবেত্তা আপন দর্শন শক্তির দ্বারা। তিনি চারপাশের সবকিছুকে-সব ঘটনা প্রবাহকে প্রত্যক্ষ করেছেন নির্মোহ দৃষ্টিতে। তিনি নিজে শৈশব-বাল্য-কৈশোর অতিকম করেছেন আর প্রতিটি পালাবদলের সাথে জাতীয় জীবনের পালাবদলও প্রত্যক্ষ করে করেছেন দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে। এই দ্বান্দ্বিক পর্যবেক্ষণের একটি অনুপম ফসল যতীন স্যারের ‘পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু দর্শন’। জন্মেছেন বৃটিশ আমলে- শিক্ষালাভ ও বড় হয়েছেন পাকিস্তান আমালে-কর্ম ও মর্মজীবন বাংলাদেশ আমলে। এই তিন আমলের কার্যকরণের রসায়নের মিথস্ক্রিয়ায় ‘পাকিস্তানের জন্ম মৃত্য দর্শন’-এর আবির্ভাব যেখানে ‘যতীন সরকার’ যতন করে ‘বাংলাদেশ’ নামক প্রিয় মাতৃভূমির রক্তাক্ত ইতিহাসের জন্মপর্ব চিত্রিত করেছেন। ২০০৫ সালে দৈনিক প্রথম আলো: মননশীল শাখায়’ বর্ষসেরা বই হিসেবে ‘পাকিস্তানের জন্মমৃত্যু -দর্শন’ গ্রন্থের জন্য যে শংসাবচন প্রদান করা হয়, তা-অধ্যাপক যতীন সরকারের জীবনের সেরা প্রাপ্তি বলে চিহ্নিত করা যায়। এখানে আমরা প্রাসঙ্গিকভাবে উক্ত শংসা বচন তুলে ধরছি ইতিহাসের নির্মোহ বক্তা যতীন সরকারকে উপলব্ধি করতে:
যতীন সরকার তাঁর ‘পাকিন্তানের জন্মমৃত্যু-দর্শন’ গ্রন্থে শুধু ব্যক্তিজীবনের কথাই বেশী করে বলেছেন। এই বই ঘনিষ্ঠভাবে ইতিহাস-সংলগ্ন একটি আত্মজীবনী। এই বই পাকিস্তান পূর্ব সময়ের ও পাকিস্তান পর্বের সিকি শতাব্দীর মফস্বলবাসী হিন্দু-মুসলমান মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত সমাজের বিশ্বস্ত ছবিতে পূর্ণ এক চিত্রশালা, সেখানে ভিড় করেছেন সাধারণের মধ্যেও অসাধারণ বহু ব্যক্তি। সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির উত্থান দেখেছেন লেখক, আর এই ভেদবুদ্ধির শিকার হিন্দুদের মন-মানসিকতার অত্যন্ত খোলামেলা বিবরণ দিয়েছেন। হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে উদারতা, সাম্প্রদায়িকতা, মানসিকতা-অমানবিতার এক স্মরণীয় বিবরণ দিয়েছেন প্রাঞ্জল ভাষায়, এক ক্ষমতাসুন্দর দৃষ্টিকোন থেকে।
বাম রাজনীতির প্রভাবে লেখকের চিন্তা-চেতনা বিকাশের কথা, মফম্বলবাসী বেশ কিছু মুক্তবুদ্ধি ও প্রতিক্রিয়াশীলতা ও প্রগতিবাদী কম্যুনিষ্ট ভাবধারা, ৪৭-এর স্বাধীনতা, দূর মফস্বলে ভাষা আন্দোলনের ঢেউ, ৫৪ এর নির্বাচন, ৬৫ এর পাক-ভারত যুদ্ধ, ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান ইত্যাদি জাতির জীবনে উল্লেখযোগ্য ঘটনা পরম্পরার বিবরণ ও বিশ্লেষণ একদিকে যেমন উপন্যাস পাঠের মোহনীয়তা সৃষ্টি করে; অন্যদিকে পাঠকের ভাবনাকে অনবরত জাগ্রত রাখে। পাঠক শুধু একজন রূচিশীল যুক্তিবাদী অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তির পরিচয় নয়, একই সঙ্গে পাকিস্তানের জন্মপূর্ব কাল থেকে বাংলাদেশের অভ্যূদয় পর্যন্ত একটি ঐতিহাসিক সময়ের পরিচয় ও একটি স্বপ্নভঙ্গেরও তাৎপর্য সমন্বিত উচ্চমানের সাহিত্যকর্মের স্বাদ গ্রহণ করেন।
একটি স্বপ্নভঙ্গের ও স্বপ্নের পুনরুত্থানের অতুলনীয়, অনবদ্য কাহিনি ‘পাকিস্তানের জন্মমৃত্যু-দর্শন’।
যতীন সরকারকে বিধাতা যেন বিশেষ যত্ন সহকারে সৃষ্টি করেছেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সম্পর্কে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন-‘মাঝে মাঝে বিধাতার নিয়মের এরূপ আশ্চর্য ব্যতিক্রম হয় কেন, বিশ্ব্কর্মা যেখানে চারকোটি বাঙালি নির্মাণ করিতেছিলেন, সেখানে হঠাৎ দুই-একজন মানুষ গড়িয়া বসেন কেন, তাহা বলা কঠিন।’ কথাটি বিদ্যাব্রতী যতীন সরকার সম্পর্কেও সমভাবে প্রযোজ্য হতে পারে। যতীন সরকার বিদ্যার ক্ষেত্রে-মানবতার ক্ষেত্রে এক অতুলনীয় নাম। তাঁরই একান্ত মুগ্ধ ছাত্র ষাটের দশকের চারণ কবি মুশাররাফ করিম ‘যতীন সরকার: তুলনারহিত নাম’ অভিধায় যে কবিতাটি রচনা করেছেন, তা আমরা এখানে তুলে ধরছি যতীন সরকারকে উপলব্ধি করার জন্য-
আমার চৈতন্যে যতীন সরকার একটি তুলনারহিত নাম।
তাঁর স্বকণ্ঠ আবৃত্তি শুনে বাংলাদেশ যখন
সমাজ পরিবর্তনের উত্তেজনায় কাঁপে,
একমাত্র আমি থাকি অটল, কাঁপিনা।
একদিন ক্লাসঘরে তাঁর কাছ থেকে আমি
পাকিয়েছি মেধা, ঋদ্ধ করেছি মনন।
লেন্সের আড়ালে বুদ্ধিদীপ্ত চোখ থেকে
চুরি করে আমার চোখে ভরেছি
প্রতিভার আলো;
একদিন তিনি ছিলেন আমার কাব্যচর্চার প্রেরণা।
আমার জীবনপ্রণালী আলোকিত করতে
তাঁর অবদান অকিঞ্চিতকর।
আজ এতো বছর পর আমরা কার্যত দ্বিধাবিভক্ত
একজন দাঁড়িয়ে আছেন উত্তর মেরুতে আর আমি
দক্ষিণ শিবিরে।
তিনি নিষ্ঠাবান প্রগতিবাদী, উড়িয়ে দিয়েছেন
প্রলেতারিয়েত আদর্শের লাল নিশান;
দৃঢ় ঋজু হাঁটছেন মার্কস এঙ্গেলস লেলিন
মাওয়ের প্রদর্শিত পথে-
আর আমি ঠাণ্ডা মাথায় ডানপন্থী এবং ধর্মভীরু;
এক লিবারেল ডেমোক্রেট।
তিনি ভালোবাসেন হোচিমিনের কাব্য
আমার বেশ লাগে জীবনানন্দ,
তিনি চে-কেস্ট্রোর মতো সাহসী আমি ভীরু কাপুরুষ।
যেনো আমরা নিয়ত অবতীর্ণ নীরব ডুয়েলে,
নিঃসঙ্গ চিত্তে বলি, তার ধ্যান আজ আর মোটেও
আমার ধারণা নয়।
তথাপি তিনি তুলনারহিত যতীন সরকার
চিরকাল থাকবেন আমার শ্রদ্ধার পাত্র
কেননা তিনি শিক্ষাগুরু, আমি তাঁর ছাত্র।
অধ্যাপক যতীন সরকার আমাদের মাঝে আলোকবর্তিকা হয়ে চিরঞ্জীব থাকবেন। জয়তু: অধ্যাপক যতীন সরকার।

লেখক : উপ-সচিব
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, ঢাকা।

আপনার মতামত লিখুন :