করোনাকালে অমানবিকতার গল্প শোনালেন অ্যাম্বুলেন্স চালক মুনসুর

জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশিত : বৃহস্পতিবার ১৮ জুন, ২০২০ /

অ্যাম্বুলেন্স চালক মুনসুর। বয়স ৩২ বছর। জীবনের প্রায় অর্ধেক সময় তিনি অ্যাম্বুলেন্স চালিয়েই কাটিয়েছেন। তবে তিন মাসের করোনাকালে যত অমানবিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন বাকি জীবনে আর হননি। তার সঙ্গে কথা বলে এমনই সব হৃদয় বিদারক ঘটনা শোনা গেল।

তিনি বলেন, চলতি মাসের শুরুর দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনার উপসর্গ নিয়ে তামান্না নামে (৯) এক শিশুর মৃত্যু হয়। তার বাড়ি নেত্রকোনা জেলার সদর উপজেলার ঠাকরাকোনা ইউনিয়নের একেবারে শেষ প্রান্তে দশদার গ্রামে। শিশুরটির মৃত্যুর পর তার বাবা অনেক অ্যাম্বুলেন্স চালককে নেত্রকোনায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। কিন্তু করোনায় বা করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া লাশ কেউ নিতে রাজি হয়নি।

অবশেষে দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলে শিশুটির বাবা আমার কাছে কাঁদতে কাঁদতে এলে আমি আর ফিরিয়ে দিতে পারিনি। আমি লাশ নিতে রাজি হই। পরে সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে আমি লাশ গাড়িতে তুলে রওনা হই। উপজেলার একেবারে শেষ প্রান্তে দশদার গ্রাম। দশদার গ্রামের নামে ওইখানে একটা ব্রিজ আছে। ওই ব্রিজের কাছে যেতে রাত আনুমানিক ৯টা বেজে যায়।

কিন্তু লাশ নিয়ে দশদার ব্রিজ পার হয়ে গ্রামে ঢুকতেই এলাকার লোকজন অ্যাম্বুলেন্স গ্রামে ঢুকতে দেবে না বলে রাস্তা আটকায়। এমনকি শিশুর আত্মীয়-স্বজনও আমাদের গ্রামে ঢুকতে বাধা দেয়। একপর্যায়ে গ্রামবাসীর কাছে অনুরোধ করে শিশুটির বাবা বলেন, আমার মেয়ে করোনা আক্রান্ত না, আমার মেয়েকে আমার বাড়ির কাছে কবর দিতে দেন। কিন্তু কোনো কথাতেই কাজ হলো না।

আমিও গ্রামবাসীর কাছে গিয়ে কিছু বলতে চাইলে তারা আমার দিকেও তেড়ে আসেন। আমাকে মারতে আসেন কেন আমি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে গেলাম। তারা লাঠিসোটা নিয়ে আসছে আমার অ্যাম্বুলেন্স ভাঙচুর করবে, আমাকেও মারধর করবে। এই অবস্থা দেখে আমি লাশসহ অ্যাম্বুল্যান্স নিয়ে দশদার ব্রিজে এসে পড়ি। এদিকে ওই শিশুর বাবা গ্রামে তার আত্মীয় স্বজনদের কথা বলার জন্য থাকেন। দশদার ব্রিজের কাছে আসতেই রাত প্রায় ১১টা বেজে যায়।

পরে রাত প্রায় একটার দিকে অসহায় বাবা কাঁদতে কাঁদতে অ্যাম্বুলেন্সের কাছে ফিরে আসেন। গ্রামবাসী তার মেয়েকে গ্রামে কবর দিতে দেবে না। পরে ওই লাশ নিয়ে তার নানার বাড়ি দশদার ব্রিজ থেকে আরও ৪৫ কিলোমিটার ভেতরে নেত্রকোনার কলমাকান্দায় বাংলাদেশের একেবারে শেষ প্রান্তে পাহাড়ি অঞ্চলের উদ্দেশে রওনা হই। ওইখানে যেতে যেতে আরও দুই ঘণ্টা লেগে যায়। নিহতের নানার বাড়িতে যেতে রাত ৩টা বেজে যায়।

সেখানে গিয়েও পড়তে হয় বিপাকে। নিহতের নানার বাড়ির লোকজন বাধা না দিলেও ভোর হওয়ার আগে তাদের পারিবারিক গোরস্তানে কবর দেয়ার কথা বলে লাশ নামাতে দেয়। কিন্তু লাশ নামাতে কেউ এগিয়ে আসে না। অবশেষে শিশুর বাবার সঙ্গে লাশ বাড়িতে নিয়ে যাই। এ সময় আমাকে সঙ্গে নিয়েই লাশ দাফনের জন্য অনুরোধ করেন শিশুটির বাবা। কিন্তু রাজি হইনি। কারণ ভোর হলে যদি কেউ আমার গাড়ি ভাংচুর করে, এই ভয়ে আমি চলে আসি। পরে কী হয়েছে তা আর জানি না।

কথাগুলো বলার সময় তার দুই চোখের কোণে জমে ওঠা পানি টলটল করছিল।

এ সময় অ্যাম্বুলেন্স চালাতে গিয়ে কোনো সমস্যায় পড়েন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, করোনা যখন প্রথম প্রথম দেশে ধরা পড়লো তখন যেখানে ভাড়া থাকি সে এলাকার মানুষ কিছুটা সমস্যা করেছে। এখন আর করে না। তবে, আমরা অ্যাম্বুলেন্স চালকরা যখন কোনো দোকানে চা খেতে যাই। আমাদের দোকানে বসতে দেয় না। আমাদেরকে চা দিতেও চায় না। কোনো জায়গায় গিয়ে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নেমে এক গ্লাস পানি চাইলেও দিতে চায় না। তাদের আচরণ দেখে মনে হয় আমরা অন্য গ্রহ থেকে এই দেশে এসেছি।

তিনি আরও বলেন, আমরা বাইরে যতটা না সমস্যায় পড়ি। আমাদের পরিবার, বউ, বাচ্চারা আরও বেশি সমস্যায় পড়ে। তাদের সঙ্গে কেউ কথা বলতে চায় না। আমাদের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে কেউ খেলাধুলা করতে বা মেলামেশা করতে চায় না। আমরা অল্পশিক্ষিত হতে পারি। আমরা টাকার বিনিময়ে সেবা দেই। কিন্তু আমরা অ্যাম্বুলেন্স চালকরা একজন করোনা রোগীর যতটুকু কাছে গিয়ে সেবা দিই ততটুকু রোগীর স্বজনরাও দেন না। তারপরও আমরা অবহেলিত।

এসব বিষয়ে অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতি ময়মনসিংহ জেলার সভাপতি সেলিম মিয়া বলেন, করোনার এই মহামারির সময় সবার আগে ঝুঁকি নিচ্ছেন অ্যাম্বুলেন্স চালকরা। অনেকের নিরাপত্তা সামগ্রীও নেই। শুধু টাকার জন্য নয়, মানবিক কারণে এখনও তারা কাজ করে চলেছেন। সরকারের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে সরকার যেন অ্যাম্বুলেন্স চালকদের দিকে নজর দেন।

আপনার মতামত লিখুন :