করোনাকালীন মধ্যবিত্তের উপাখ্যান -ওবায়দুর রহমান

ওবায়দুর রহমান
প্রকাশিত : রবিবার ২৬ এপ্রিল, ২০২০ /
ওবায়দুর রহমান

মধ্যবিত্ত শব্দটিই একটি নির্মম উপাখ্যান। চাপা কষ্টগুলো চাপাই থাকে, না পারে কাউকে বলতে, না পারে কারো কাছে যেতে। এমনই এক কষ্টের বৃত্তান্ত মধ্যবিত্তের। কষ্টগুলোকে কখনো প্রকাশ করতে নেই। কান্না আসলেও প্রকাশ্যে কাঁদা যাবে না, আড়ালে নিরবে কাঁদতে হবে। এক কথায় মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মানুষের গল্পই এমন অসহায়ত্বের। যারা কারো কাছে হাত পাততে পারে না। প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের আশ^াসেও তারা ফোন পর্যন্ত করতে পারে না লোক লজ্জার ভয়ে। বর্তমান বিশে^ এক অদৃশ্য পরাশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করছে পৃথিবীর সকল রাষ্ট্র ও মানুষ। আর এই নভেল করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় ও সংক্রমন রোধে গত এক মাসের বেশি সময় ধরে গৌরীপুরেও ঔষধ ও নিত্যপণ্য ছাড়া সব ধরণের দোকানপাট অনির্দিষ্ট কালের জন্য লকডাউন বা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

সেই সাথে বন্ধ হয়ে গেছে মধ্যবিত্তের রোজগার। প্রশাসনের নির্দেশ মেনে বাজারে ভাড়া নেওয়া দোকানটি বন্ধ রাখা হয়েছে। খুব বেশি প্রয়োজন না পড়লে কেউ ঘর থেকে বের হতে নিষেধ। তারপরও বাধ্য হয়েই পরিবারের খাবার যোগানের জন্য এই নিষেধাজ্ঞা উপক্ষো করে বাজারে আসতে হয়, যেতে হয় দোকানপাটে। আবার তাদের অনেকেই বেঁচে থাকার জন্য বিভিন্ন সংস্থা বা ব্যাংক ঋণ নিয়ে ঘর মালিককে অগ্রীম টাকা দিয়ে দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করে আসছিলেন। সরকারি নির্দেশ মোতাবেক দোকান বন্ধ থাকায় তাদের মাথার উপর প্রতিদিনই ভর করছে বাড়তি ঋণের বোঝা। আর সেই সাথে পরিবারের রোজগারের চিন্তার বিষয়টিও। তাই তাদের বোবা কান্না ছাড়া আর উপায় নেই। এমতাবস্থায় কোনমতে চালাতে হচ্ছে তাদের সংসার। তারপর রয়েছে সন্তানদের বিভিন্ন ধরণের আবদার। প্রতিদিনই কোনমতে এগুলোর ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে সামনের দিনগুলোর কি হবে সেই ভাবনায় মধ্যবিত্তদের বিপদের আশংখা ও হাহাকার। দুর্বিসহ হয়ে ওঠে জীবনযাপন। অনেকে হয়তো বন্ধু-বান্ধব-স্বজন ও পরিচিতদের কাছ থেকে ধার করে পরিবারের জন্য খাবার যোগাড় করে চলেছেন। আবার কেও কেও হয়তো পরিবার নিয়ে না খেয়েই লোকলজ্জার ভয়ে ভালো থাকার অভিনয় করছেন। এসময় খুব বেশি কাছের মানুষ না হলে টাকাও ধার দিতে চায় না। গৌরীপুর উপজেলার পৌর শহরের নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ফটোকপি ও কম্পিউটার ব্যবসায়ী জানান, ‘গত এক মাস যাবত আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ রয়েছে। এই ব্যবসা দিয়েই সংসার চলতো আমার। ভাই-বোন, স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি নিয়ে চলতে খুবই কষ্টকর। ব্যাংকেও কোন জমানো টাকা নেই।’

আরেক ব্যবসায়ী বলেন, ‘ছোট দোকান করে ৫ জনের সংসার চালাতাম। কিন্তু সরকারি নির্দেশ মানতে গিয়ে এখন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এই অবস্থাটা খুব কঠিন। সামনে রমজান মাস কিভাবে চলবো বুঝতে পারতেছি না। কারো কাছেও যাওয়া যাবে না।’
উত্তর বাজার এলাকার এক ফ্লেক্সিলোড ব্যবসায়ী বলেন, ‘আগে সারাদিন অনেক টাকা লেনদেন হতো তা দিয়েই সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো। আর এখন তো পুরো ব্যবসাই বন্ধ। আমরা তো কারো কাছে চাইতে পারি না।’

পৌর শহরের কালীপুর এলাকার এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘দোকান ভাড়া ও বাসার ভাড়ার টাকা কিভাবে যে পরিশোধ করবো বুঝতেই পারছি না। আবার ত্রাণ ও খাদ্যসামগ্রীর জন্য লাইনে দাঁড়াতেও পারছি না। কারো কাছে এসবের কথা বলতেও পারছি না। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “বড় লোকের টাকার অভাব নেই। গরীবরা ত্রাণ পায়, আর মধ্যবিত্তরা না খেয়ে আর এসব চিন্তায় চোখের পানি লুকায়।”

পৌর শহরের এক ঔষধ ব্যবসায়ী বলেন, ‘এই করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধে সবকিছু বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঘরবন্দি সাধারণ মানুষ। নিম্ন আয়ের মানুষের হাতে ত্রাণ-খাদ্যসামগ্রী এবং প্রয়োজনীয় দ্রব্য তুলে দিচ্ছেন অনেকেই। বড়লোকদের ব্যাংকে জমানো টাকা দিয়ে ভালোভাবেই পরিবার পরিজন নিয়ে সংসার চলছে তাদের। তবে মধ্যবিত্তদের পাশে নেই কেউ। ঘরে খাবার না থাকলেও মধ্যবিত্তরা চক্ষুলজ্জায় কিছু বলতে পারছে না। মধ্যবিত্তরা পারছে না শ্রমিকের কাজ করতে, রিক্সা চালাতে, না পাচ্ছে সরকারি-বেসরকারি ও কোনো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ত্রাণ ও খাদ্যসামগ্রী সহায়তা। একমাত্র মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকজনেরাই শুধুমাত্র বর্তমান সময়ে অতি কষ্টে মানবেতর দিনযাপন করে চলেছে বলে তিনি জানান।” গৌরীপুর পৌর শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কয়েকজন ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলে বুঝা গেলো মধ্যবিত্তদের জীবন কতোটা মানসিক যন্ত্রণার, তা কেবল তারাই বোঝে!

লেখক : সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী
গৌরীপুর শাখা সংসদ।

আপনার মতামত লিখুন :