করোনায় বেড়েছে বাল্যবিয়ে, লাগাম টানতে দরকার আইনের প্রয়োগ

গৌরীপুর নিউজ
প্রকাশিত : রবিবার ১৬ আগস্ট, ২০২০ /

করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। এই ভাইরাসের কারণে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে অনেক অভিভাবক কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন। কাজ না থাকায় অনেকের ঘরেই অভাব। সামাজিক নিরাপত্তার বিষয় চিন্তা করে অনেক বাবা-মা কন্যাশিশুটিকে নিজের কাছে রাখতে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। এ পরিস্থিতিতে গ্রাম ও শহরে কন্যাশিশুকে লুকিয়ে বিয়ে দিচ্ছেন অনেক অভিভাবক। ফলে দেশে ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে বাল্যবিয়ে।

করোনাভাইরাস প্রার্দুভাবের কারণে গত ক’মাসে দেশে বাল্যবিয়ের হার স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে বলে সাম্প্রতিক এক জরিপে উঠে এসেছে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের (এমজেএফ) ওই টেলিফোন জরিপে বলা হয়েছে, জুন মাসে ৪৬২টি কন্যাশিশু বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ২০৭টি বাল্যবিয়ে বন্ধ করা গেছে। তার আগের মে মাসেও ১৭০টি বাল্যবিয়ে হয়। অবশ্য বন্ধ করা গেছে ২৩৩টি।

বাল্যবিয়ে রোধে ২০১৭ সালে একটি আইন পাস হয়েছে। ওই আইনে বলা হয়, কোনো নারী ১৮ বছরের আগে এবং কোনো পুরুষ ২১ বছরের আগে যদি বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন, তাহলে তাকে দুই বছর কারাভোগ করতে হবে। যারা বিয়ে সম্পন্ন করবেন তাদেরও একই শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

এমজেএফের জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, যে হারে বাল্যবিয়ে বাড়ছে, তাতে বিদ্যমান আইনের সঠিক প্রয়োগ দরকার। তাতেই বাল্যবিয়ে কমবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জরিপে যা উঠে এসেছে
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে বাল্যবিয়ে সংক্রান্ত জরিপের ফলাফল তুলে ধরেন। এতে ইউনিসেফের তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়, এদেশে ৫৯ শতাংশ মেয়ের বয়স ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে হয়। আর ২২ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় ১৫ বছরের আগে। বাল্যবিয়ের দিক দিয়ে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ।

জরিপে আরও দেখা যায়, জুন মাসে দেশের ৫৩ জেলায় মোট ১২ হাজার ৭৪০ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মে মাসে এই সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৪৯৪। জুনে নির্যাতনের শিকার নারীদের মধ্যে তিন হাজার ৩৩২ জন নারী ও শিশু আগে কখনোই নির্যাতিত হননি। জুনের শুরুতে বেড়েছে শিশু নির্যাতন। শিশুরা তাদের বাবা-মায়ের হাতেই নির্যাতনের শিকার। গৃহবন্দি থাকার কারণে এমন নির্যাতন বেড়েছে।

জুনে ৫৩ জেলায় মোট ৫৭ হাজার ৭০৪ জন নারী ও শিশুর সঙ্গে কথা বলে এই জরিপ করা হয়েছে বলে জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।

শাহীন আনাম বলেন, সহিংসতার শিকার শিশু ও নারীদের এমজেএফের সহযোগী সংগঠনগুলোর মাধ্যমে কাউন্সেলিং, ফলোআপ এবং সেবা প্রদানকারী সংস্থা, স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ সহায়তা, চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা দেয়া হয়েছে। এছাড়া সরকারের প্রতি স্থানীয় সরকার পর্যায়ে বিশেষ সার্কুলার দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে নারীর প্রতি সহিংসতা ও বাল্যবিয়ে বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

তিনি জানান, ২০১৮-২০৩০ সালের মধ্যে বাল্যবিয়ে নিরোধ সংক্রান্ত ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়নে এবং করোনার কারণে কন্যাশিশু ও কিশোরী মেয়েদের সামাজিক নিরাপত্তা বিধানে চলতি অর্থবছরে কোনো নির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখা হয়নি, যদিও বাংলাদেশ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে বাল্যবিয়ে এবং জোর করে বিয়ে বন্ধ করার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ।

শাহীন আনাম আরও বলেন, সরকার কিশোরীদের বিদ্যালয়ে যে অর্থ প্রণোদনা দেয়, সে কারণে বাবা-মা কিশোরীদের বিদ্যালয়ে পাঠান। এটা অনেকাংশে বোঝা যাচ্ছে। প্রণোদনা বন্ধ। তাই একটি খাবার মুখের সমস্যার সমাধান করার জন্য বাবা-মা মেয়েকে বিয়ে দেয়াটাই চূড়ান্ত সমাধান মনে করছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকার ও ব্যক্তি সচেতনতায় এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগে এই বাল্যবিয়ে প্রথা বন্ধ হতে পারে।

বাল্যবিয়ের শাস্তি
বাল্যবিয়ে নিরোধ আইনের ৭ (১) ধারায় বলা হয়েছে, প্রাপ্ত বয়স্ক কোনো নারী বা পুরুষ বাল্যবিবাহ করলে তা হবে একটি অপরাধ। এজন্য তিনি সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। অর্থদণ্ডের টাকা না দিলে তাকে আরও তিন মাস কারাভোগ করতে হবে।

বাল্যবিয়ে নিরোধ আইনের ৭ (২) ধারায় বলা হয়েছে, অপ্রাপ্ত বয়স্ক কোনো নারী বা পুরুষ বাল্যবিবাহ করলে সে এক মাসের আটকাদেশ বা পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

বাল্যবিয়ে সংশ্লিষ্ট পিতা-মাতাসহ অন্যান্য ব্যক্তির শাস্তি
বাল্যবিয়ে নিরোধ আইনের ৭ ধারায় বলা হয়েছে, পিতা-মাতা, অভিভাবক অথবা অন্য কোনো ব্যক্তি আইনগতভাবে বা আইনবহির্ভূতভাবে কোনো অপ্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে বাল্যবিয়ে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে কোনো কাজ করলে অথবা করার অনুমতি বা নির্দেশ প্রদান করলে অথবা স্বীয় অবহেলার কারণে বিয়েটি বন্ধ করতে ব্যর্থ হলে তা হবে একটি অপরাধ। সেজন্য তিনি সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। অর্থদণ্ড পরিশোধ না করলে তাকে আরও তিন মাসের কারাভোগ করতে হবে।

বাল্যবিয়ে সম্পাদন বা পরিচালনা করার শাস্তি
বাল্যবিয়ে নিরোধ আইনের ৯ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বাল্যবিয়ে সম্পাদন বা পরিচালনা করলে তা হবে একটি অপরাধ। এজন্য তিনি সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। অর্থদণ্ড পরিশোধ না করলে তাকে আরও তিন মাস কারাভোগ করতে হবে।

বাল্যবিয়ে নিবন্ধনের শাস্তি
বাল্যবিয়ে নিরোধ আইনের ১১ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো বিবাহ নিবন্ধক বাল্যবিবাহ নিবন্ধন করলে তা হবে একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এজন্য তার সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। অর্থদণ্ডের টাকা পরিশোধ না করলে তাকে আরও তিন মাস কারাভোগ করতে হবে।

বাল্যবিয়ে নিরোধ আইনটি ২০০৯ সালের মোবাইল কোর্ট আইনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যাবে। অর্থাৎ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে বাল্যবিয়ে আইনের শাস্তি দেয়ার বিধান রয়েছে।

এ বিষয়ে আইনজীবী ফারুক আহম্মেদ বলেন, বাল্যবিয়ে করলে সর্বোচ্চ শাস্তি দুই বছরের কারাদণ্ড রয়েছে। এই আইন বাস্তবায়ন করলে দেশে বাল্যবিয়ে কমে আসবে।

আইনজীবী জিএম মিজানুর রহমান বলেন, আমাদের দেশে বাল্যবিয়ে দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে যে শাস্তির বিধান রয়েছে, তা অনেকে জানে না। আইনে শাস্তির বিষয়টি সবাইকে জানাতে হবে। বাল্যবিয়ের ক্ষতির বিষয়েও সচেতন করতে হবে। আইনের সঠিক প্রয়োগ হলে দেশে বাল্যবিয়ে কমে আসবে।

আইনজীবী খাদেমুল ইসলাম বলেন, আইনের বাস্তবায়ন হলেই কমবে বাল্যবিয়ে। সরকারের উচিত বাল্যবিয়ে আইনটি বাস্তবায়ন করা। অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা।

আপনার মতামত লিখুন :