দারিদ্রের কাছে হার মানেনি গৌরীপুরের অদম্য মেধাবী শামছুল

মশিউর রহমান কাউসার
প্রকাশিত : শনিবার ৬ জুন, ২০২০ /
শামছুল আলম

দরিদ্রতাকে সঙ্গী করে সবার নজর কেড়েছেন ভ্যানচালক রফিকুল ইসলামের ছেলে অদম্য মেধাবী মো. শামছুল আলম।

চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষায় ময়মনসিংহের গৌরীপুর আর.কে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান শাখায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে অন্ধকার ঘরে যেন আলো জ্বালিয়েছে সে।

পরিবারে অভাব অনটনে শত প্রতিকূলতা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি তার মেধা বিকাশে। মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হতে চায় সে। কিন্তু এ স্বপ্ন পূরণের মাঝে দেয়াল দরিদ্রতা। আকাশ ছোঁয়া এ সাফল্যেও শামছুলের মনে এখন শঙ্কার পাহাড়। দু’চোখে অন্ধকার, তারপরও সামনে এগিয়ে যাওয়ার দুর্বার সাহস তার। সে কি পারবে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে?

গৌরীপুর উপজেলা সদর থেকে দুই কিলোমিটার উত্তরে গজন্দর পূর্বপাড়া গ্রামে শামছুলের বাড়ি। তিন শতক জমির উপর জরাজীর্ণ টিনের ঘরে তাদের ছয় সদস্যের পরিবারের বসবাস। বৃষ্টির পানি থেকে রক্ষা পেতে সেই ঘরে ফুটো হয়ে যাওয়া ঢেউটিনের চালায় পলিথিন দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয়েছে। পাশে বাঁশের ছোট একটি ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করেন দাদা মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিল। তিন ভাই এক বোনের মাঝে শামছুল সরবার বড়। ছোট ভাই নাজমুল ইসলাম আগামী বছর এসএসসি পরীক্ষা দেবে। অপর ভাই সিরাজুল ইসলাম ও বোন জান্নাতুল ইসলাম মাদরাসায় পড়ে। ভ্যানচালক বাবা রফিকুল ইসলামের স্বল্প রোজগারে কোনো মতে খেয়ে না খেয়ে চলে তাদের সংসার। দাদার মুক্তিযোদ্ধা ভাতার টাকায় চলে তাদের লেখাপড়ার খরচ।

অভাব অনটন ছিল শামছুলের নিত্যসঙ্গী। উপোস করে স্কুলে আসা ছিল নিত্য ঘটনা। মাত্র একটি স্কুল ড্রেসে কেটে গেছে দু’বছর। প্রাইভেট পড়ার সামর্থ্য না থাকায় সিনিয়র ছাত্রদের কাছ থেকে পড়া দেখিয়ে নিত সে। শুধু এসএসসি পরীক্ষার আগে স্থানীয় একগৃহ শিক্ষক তাকে তিন মাস ফ্রিতে প্রাইভেট পড়িয়েছেন। এসব প্রতিকূল পরিবেশের মাঝে এসএসসিতে সাফল্য অর্জন করে সে। এর আগে জেএসসিতে জিপিএ-৫ পায় শামছুল। তার এ সাফল্যে পরিবারের সবাই খুশি হলেও ভবিষ্যতের লেখাপড়ার খরচ নিয়ে উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে তাদের।

শামছুলের বাবা রফিকুল ইসলাম জানান, ভিটের জমিটুকু ছাড়া তার আর কোনো জমি নেই। সারাদিন ভ্যানচালানোর আয় দিয়ে পরিবারের সদস্যদের দু’বেলা খাবারই জোটে না। সন্তানদের লেখাপড়ার জোগাবেন কি করে?

তিনি বলেন, শামছুলের এ কৃতিত্বের পেছনে অবদান আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিলের। তিনি চার নাতিকে উচ্চ শিক্ষিত হিসেবে গড়ে তুলতে চান। তাই নিজে একটি বাঁশের ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করে কোনো রকমে খেয়ে না খেয়ে মুক্তিযোদ্ধা ভাতার সব টাকা খরচ করছেন নাতিদের লেখাপড়ার পেছনে।

শামছুলের মা কমলা খাতুন বলেন, অভাব-অনটনের কারণে কোনো সময় আমার ছেলেকে ভালো খাবার ও পোশাক দিতে পারিনি আমরা। নানা সংকটে অনেক কষ্ট সহ্য করে ছেলের লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছি। আমার স্বপ্ন শামছুল উচ্চ শিক্ষা লাভ করে প্রতিষ্ঠিত হয়ে পরিবারের হাল ধরবে একদিন।

এদিকে শামছুলের সাফল্যে তার দাদা আব্দুল জলিল সবচেয়ে বেশি খুশি হলেও নাতির ভবিষ্যতের লেখাপড়া নিয়ে শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন তিনি।

আব্দুল জলিল জানান, নিজের ভিটের জমি ছাড়া আর কোনো জমি নেই তার। তার একমাত্র আয়ের উৎস হচ্ছে সরকারের মুক্তিযোদ্ধা ভাতা। আর এ ভাতার টাকা তিনি ব্যয় করে আসছেন চার নাতির লেখাপড়ার পেছনে। এজন্য তাকে বৃদ্ধ বয়সে ঝুপড়ি ঘরে অতিকষ্টে দিনযাপন করতে হচ্ছে। এতে তার মনে কোনো কষ্ট নেই। শামছুলের উচ্চ শিক্ষা লাভের স্বপ্ন পূরণে সবার সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

শামছুল ইসলাম বলেন, আমি ময়মনসিংহ সদরের সৈয়দ নজরুল ইসলাম কলেজে ভর্তি হতে চাই। শিক্ষা জীবন শেষে একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই।

আপনার মতামত লিখুন :