বঙ্গবন্ধু রয়েছেন কোটি হৃদয়ে

গৌরীপুর নিউজ
প্রকাশিত : শনিবার ১৫ আগস্ট, ২০২০ /

ওমর ফারুক

দিনটি ছিলো বুধবার, ১৭ মার্চ ১৯২০। গোপালঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় এক নক্ষত্রের আগমন। বাবা শেখ লুৎফর রহমান ও মা সায়েরা খাতুনের ঘর আলো করে এলেন সেই নক্ষত্র। বড় আদরের খোকা ছোটবেলা থেকে ছিলেন শান্তশিষ্ট ও মানবদরদি। বলছি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা। তার ডাক নাম ছিলো খোকা। ছোটবেলা থেকে খোকা মানবসেবায় অটল ছিলেন। একদিন প্রচণ্ড শীতে স্কুল থেকে ফেরার পথে খোকা দেখতে পান একটি গাছের নিচে বসে একজন ভিক্ষা করছেন। বুড়ো মানুষ শীতে ঠকঠক করে কাঁপছেন। খোকা নিজের গায়ের চাদর বুড়োর গায়ে জড়িয়ে দিলেন।

মানুষের প্রতি খোকার আবেগ-অনুভূতি দেখে বাবা-মা কখনোই কোনো কাজে বাধা দেননি। তারা জানতেন মুজিব অন্য ছেলেদের থেকে আলাদা। মানুষের কল্যাণে খোকা সর্বদা অবিচল। খোকা ছোটবেলা থেকে স্বেচ্ছাসেবী কাজে নিযুক্ত ছিলেন। তার গৃহ শিক্ষক হামিদ মাস্টারের নেতৃত্বে একটি ‘মুসলিম সেবা সমিতি’ গঠন করা হয়েছিল। সমিতির অন্যতম সংগঠক ও একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন শেখ মুজিব। সমিতি গরিব ছেলেদের সাহায্য করত। প্রতি রবিবার থলি নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে মুষ্টি চাল উঠিয়ে আনা হতো এবং সেই চাল বিক্রি করে গরিব ছেলেদের পড়াশোনার খরচ চালানো হতো।

১৯৩৯ সালে গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুলে গিয়েছিলেন বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও মন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। সেখানে বঙ্গবন্ধু বলিষ্ঠ কণ্ঠে স্কুলের সব দুর্দশার চিত্র তাদের কাছে বর্ণনা করেন। তার কথাগুলো ভীষণ মনোযোগ দিয়ে শোনেন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী। মিশনারি স্কুল থেকে ১৯৪২ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন শেখ মুজিব। পরে ভর্তি হন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে। ১৯৪৯ সালে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বঙ্গবন্ধুকে বহিষ্কার করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র ছিলেন তিনি। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। সে সময় সংগঠনের যুগ্ম সম্পাদক হন শেখ মুজিব। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমাবর্তনে বলেছিলেন, ‘উর্দু হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। সুউচ্চ কণ্ঠে ছাত্র-ছাত্রীরা না না বলে সেই কথার বিরোধিতা করেন। সেই থেকে শুরু হয় বাংলা ভাষাকে রক্ষা করার সংগ্রাম। ১৯৫২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ায় গ্রেফতার হন বঙ্গবন্ধু।

১৯৬৬ সালের ১৮ মার্চ আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে ঐতিহাসিক ৬ দফা গৃহীত হয়। ওই বছরের ২৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আনুষ্ঠানিকভাবে ৬ দফা ঘোষণা করেন। বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ৬ দফা আন্দোলনে দেশব্যাপী উত্তাল হয়ে পড়ে। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক জনসভার মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেন। ওই বছরের ৫ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানকে ‘বাংলাদেশ’ নামে ভূষিত করেন বঙ্গবন্ধু।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনসভা করেন বঙ্গবন্ধু। সারাদেশ থেকে ছুটে এসেছিলো সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। ১৮ মিনিটের ভাষণে কোটি বাঙালিকে রণক্ষেত্রে নামার উৎসাহ দেন তিনি। জ্বালাময়ী সেই ভাষণ আজও হৃদয়ে ধারণ করছে বাঙালি। ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান কারাগারে বন্দি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। নিরস্ত্র, নিরীহ বাঙালির ওপর বর্বরতা চালায় পাক-হানাদাররা। নির্ভীক বাঙালি প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলে বাংলার সূর্য সন্তানেরা।

১৬ ডিসেম্বর বাংলার আকাশে ওড়ে লাল-সবুজের পতাকা। অর্জিত হয় স্বাধীন ভূখণ্ড। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশে ফিরে আসেন বঙ্গবন্ধু। স্বপ্ন দেখেন সোনার বাংলাকে সাজাবেন মনের মতো করে। বিশ্বের দরবারে এক অনন্য মর্যাদায় থাকবে সোনার বাংলাদেশ। কিন্তু স্বপ্ন সব ভেঙে চুরমার হয়ে যায় একরাতে। জীবনের পুরোটা সময় দেশ ও জাতির কল্যাণে লড়ে গেছেন বঙ্গবন্ধু। স্বাধীন ভূখণ্ডে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকের বুলেটে সপরিবারে তিনি নিহত হন। আজও বঙ্গবন্ধু রয়েছেন কোটি হৃদয়ে। তিনি থাকবেন অমর হয়ে।

আপনার মতামত লিখুন :