বাঁশের খুঁটিতে উঠে ধরা পড়লো অজগর

উপজেলা প্রতিনিধি
প্রকাশিত : রবিবার ২০ জুন, ২০২১ /

দিনের শুরু থেকে রাত পর্যন্ত অঝোর বৃষ্টি। বৃষ্টির পানি আশেপাশে ছোট বড় মাঠ ও রাস্তাঘাটে কাঁদা ও কোথাও কোথাও এখনো জমে আটকে আছে পানি। এমন শীতল পরিবেশে সামান্য উষ্ণতার খোঁজে রাতের আঁধারে বের হয়েছে একটি অজগর । চারিদিকে ঘনবসতি ও মানুষের কোলাহলে ভীত অজগরটি নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে টিনের বেড়ার উপর বাঁশের খুঁটিয়ে আঁকড়ে ধরেছে ।

ঠিক একই পথেই সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে বাড়ি ফিরছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা। অন্ধকারে ছোট টর্চ লাইটের আলোয় হেঁটে চলছেন সামনের দিকে । কিছুদূর যেতেই লাইটের আলোয় কিছু একটা ঝলমলিয়ে উঠতে দেখে দাঁড়িয়ে যান। প্রথমে বাদুর ভেবে গেলেও সামনে এসে আলোয় বস্তুটিকে নাড়াচাড়া করতে দেখে আশপাশের মানুষদের ডাকাডাকি শুরু করেন। বাকিরাও ছুটে এসে শুরু হয় অজগর মারার প্রতিযোগিতা।

অজগরটি মারার এই চেষ্টা নেত্রকোনার দুর্গাপুরের। শুক্রবার মধ্যরাতে পৌর শহরের চরমোক্তারপাড়া এলাকার একটি বাসায় ধরা পড়ে অজগরটি। স্থানীয়রা হাতের কাছে যে যা পেয়েছেন তা নিয়ে ছুটে এসেছেন অজগরটিকে মেরে ফেলতে। তবে শেষ পর্যন্ত তাদের মেরে ফেলার এই চেষ্টা যেন পুরোপুরি বৃথা যায়। রাতেই অজগরটি ধরা পড়ার খবর বন্যপ্রাণী রক্ষায় স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সেভ দ্য এনিমেলস অফ সুসং সংগঠনের সদস্যরা জানতে পেরে ঘটনাস্থলে এসে উদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু করেন ।

অজগরটি ধরা পড়ার খবর শুনে রাতের আঁধারে অনেকেই ছুটে আসেন সাপ দেখতে। মানুষের ভিড় ও স্থানীয়দের মেরে ফেলার চেষ্টায় অজগরটিও ভীত হয়ে শক্ত করে ধরে রেখে বাঁশের খুঁটি।

সংগঠনের সদস্যরা অজগরটি বিরল ও নিরীহ প্রজাতির বন্যপ্রাণী বলে স্থানীয়দের কাছে বিষয়টি তুলে ধরলে আস্ত স্থানীয়রা। পরবর্তীতে স্থানীয়দের সহায়তায় বাঁশের খুঁটি থেকে নামিয়ে অজগরটিকে উদ্ধার করেন সেভ দ্য এনিমেলস অফ সুসং সংগঠনের সদস্যরা ।

গত মে মাসের ২১ তারিখ সোমেশ্বরী নদী পানিতে থাকে একটি মেছো বাঘের ছানার উদ্ধার হওয়ার ধারণা থেকেই সংগঠনের সদস্যরা মনে করছেন বাড়িতে পাশ দিয়েই বয়ে চলা পাহাড়ি নদী সোমেশ্বরীর নদীর পানিতে হয়তো অজগরটি ভেসে চলে এসেছে। পরবর্তীতে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে রাতের আধারে লোকালয়ে চলে আসে প্রায় ৫ ফুট লম্বা ছোট এই অজগরটি ।

স্থানীয়রা জানান, আমরা অজগরটিকে দেখার পর থেকে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম । আমাদের আশপাশের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ছোট ছোট বাচ্চা মহিলারা রয়েছে । উন্মুক্ত পরিবেশে এমন একটি অজগর ঘুরে বেড়াচ্ছে শুনে তারাই সবচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছে । তাই আমরা শেষ কোনো পথ না পেয়ে এটিকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম । কিন্তু এর আগে কয়েকজন যুবক এসে অজগরটি কে মারতে বাধা দেন । এবং আমরা কয়েকজন মিলে তাদেরকে সহায়তা করলে তারাই অজগরটিকে উদ্ধার করে নিয়ে যায় ।

সেভ দ্য এনিমেলস অফ সুসং সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ অভি জানান, আমরা খবর পাওয়ার পরপরই তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে ছুটে আসি এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে পরামর্শ নিয়ে অজগরটি উদ্ধার করি। আসলে আশপাশের মানুষ অনেকটাই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ায় অজগরটিকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।

তবে আমরা এর আগেই পুরোপুরি সুস্থ ভাবে অজগরটিকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। এখন অজগরটি আমাদের কাছে রয়েছে। অজগরটি গায়েও কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। আমরা প্রশাসনকে সাথে নিয়ে সকালে সাপটিকে নিরাপদ একটি স্থানে অবমুক্ত করে আসবো। তবে অজগরটি এখনো অনেক ছোট। বিশেষ করে একটি পূর্ণবয়স্ক অজগরের থেকে এই অজগরের লম্বায় অনেক কম।

ইউএনও রাজিব উল আহসান জানান, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সেভ দ্য এনিমেলস অফ সুসং সংগঠনের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি একটি অজগর ধরা পড়েছে। পরবর্তীতে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর ও বন বিভাগের সাথে যোগাযোগ করি। তবে ছুটির দিন ও বেশি রাত হয়ে যাওয়ায় উদ্ধারের পর সংগঠনের সদস্যদের কাছে অজগরটি পরিচর্যার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। আমরা সকালে বন বিভাগ ও প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে এটি বনে অবমুক্ত করার ব্যবস্থা করবো।

তিনি আরো জানান, এর আগেও আমরা বেশ কিছু প্রাণী বনে অবমুক্ত করেছি। এছাড়াও গত ২৪ শে মে উপজেলার সদর ইউনিয়নের একটি বাড়ি থেকে অভিযান চালিয়ে একটি অজগর উদ্ধার করে চিকিৎসা শেষে বনে অবমুক্ত করা হয় ।

আপনার মতামত লিখুন :