বিলুপ্তির পথে খেজুর গাছ : মানুষ ভূলতে বসেছে খেজুর রসের গ্রান ॥

গৌরীপুর নিউজ
প্রকাশিত : মঙ্গলবার ১২ জানুয়ারী, ২০১৬ /

gp--2মোঃ কামাল উদ্দিন, গৌরীপুর: মৌসুমে গাছীদের না পাওয়া আর নতুন করে গাছ না লাগানোয় যেন বিলুপ্তির পথে গ্রামবাংলার শীতের ঐতিহ্যবাহী সেই খেজুর গাছ। ফলে শীতের সকালে গ্রাম্য হাটে হাটে খেজুর গাছের রসে ভরা হাড়ি এখন আর চোখে পড়েনা সচারচর, পাওয়া যায়না এর রসে তৈরী গুড়ের মনমাতানো সেই ঘ্রান। সময়ের ব্যবধানে যেন মানুষ ভূলতে বসেছে এ রসের ঘ্রান।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, যে হারে খেজুর গাছ নিধন হচ্ছে, সে তুলনায় এর রোপণ করা হয় না। ফলে গ্রামের কোন মাঠে বা মেঠো পথের ধারে কিছু গাছ যেন দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। গত এক যুগ ধরে ক্রমইে খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারনে এখন তা বিলুপ্ত হওয়ার পথে। ফলে সাথে সাথে এর রসও কমতে শুরু করেছে। খেজুরের রসের পায়েস এখন যেন শুধূই স্মৃতি।
খেজুরের রস আর গুড় ছাড়া আমাদের শীতকালীন উৎসব ভাবাই যায় না। কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকালে গাছ থেকে নামানো তাজা রস যে কতটা তৃপ্তিকর তা আজও বয়স্কদের মুখে শোনা যায়। শীতের রাতে চুরি করে খেজুরের রস খাওয়ার শৈশবের স্মৃতি এখনো মনে করেন অনেকে। এ রসের পিঠা-পায়েস খুবই মজাদার। শীত মৌসুমের শুরুতেই খেজুর রসের তৈরী ক্ষির, পায়েস ও পিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে যেতো গ্রামা লে।
ময়মনসিংহের গৌরীপুরে এক সময়ের পরিত্যাক্ত জমিদারবাড়ি যেখানে বর্তমান গৌরীপুর সরকারী কলেজ। এর অঙ্গিনায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় অর্ধশতাধিক খেজুর গাছের সমারোহ থাকলেও গত প্রায় এক যুগের ব্যবধানে তা কমে ৩ টিতে নেমে এসেছে। তাতেও এখন আর রসের হাড়ি ঝুলেনা। উপজেলার পরিত্যাক্ত বিভিন্ন জমিদার বাড়ির অঙ্গিনা ছাড়াও এখানকার বিভিন্ন গ্রামের মাঠে-ঘাটে, কৃষকের বাড়ির আঙ্গিনায় বা কৃষকের কৃষি জমির আইলে বেড়ে ওঠা খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে শীতের মৌসুমে বাড়তি রোজগার করত মানুষ। আর এ খেজুর গাছ ছাঁটাই করে বিশেষ কৌশলে যারা গাছ থেকে রস সংগ্রহ করতেন তাদেরকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় গাছি।
পক্ষি (৪৫) নামে পরিচিত স্থানীয় গাছি সে এখন গার্মেন্টস শ্রমিক। আগে খেজুর গাছের রস সংগ্রহ করে তিনি সংসার চালাতেন। তিনি জানান- খজুর গাছ কমে যাওয়ায় বর্তমানে তাদের চাহিদাও কমে গেছে। বর্তমানে যে কয়েকটি খেজুর গাছ আছে তাও বুড়ো হয়ে যাওয়ায় এতে আর তেমন রস পাওয়া যায় না। ফলে শীতের সকালে হাটে-হাটে ঘুরে রস বিক্রির মতো আগের সেই অবস্থা এখন আর নেই।
আগে শীত মৌসুমে ৪০/৫০টি খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করতেন উপজেলার সদর ইউনিয়নের সাতুতী গ্রামের গাছী- উছমান গনি (৬০)। তিনি এ প্রতিনিধিকে জানান- শীত মৌসুমে সংগ্রীহিত খেজুর রস দিয়ে পিঠা, ক্ষীর, পায়েস খাওয়ার পাশাপাশি গুড় তৈরি হতো। এতে আয় রোজগার ভালই হতো। কিন্তু এখন আর আগের মতো খেজুর গাছ নেই। অযতœ-অবহেলায় অনেক খেজুর গাছ নষ্ট হয়ে যাওয়া ছাড়াও মানুষ বুড়ো গাছ গুলো কেটে এর জমি অন্য কাজে ব্যবহার করা এবং নতুন গাছ না লাগানোর কারনে এখন তা বিলুপ্তির পথে।
খেজুর গাছ পরিবেশ ও ভুমির ক্ষয় রোধে খুব উপকারী। পরিবেশ রক্ষায় এবং রসের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার লক্ষে সরকারি উদ্যোগে রাস্তার পাশে খেজুর গাছ লাগানোর জোর দাবী এখানকার স্থানীয়দের। কেবল রসনা তৃপ্তরি উপকরণ সুমিষ্ট রসের জন্যই নয়, জীবনের প্রয়োজনে আর প্রকৃতির ভারসাম্য ও বাংলার ঐতিহ্য রক্ষায় ব্যাপকভাবে খেজুর গাছ রোপণ করা দরকার এমন আকুতি স্থানীয় অনেকের।

আপনার মতামত লিখুন :