মে দিবসের ইতিহাস ও আমাদের বাস্তবতা- ওবায়দুর রহমান

ওবায়দুর রহমান
প্রকাশিত : শুক্রবার ১ মে, ২০২০ /

১৮৮৬ সালের আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটের সামনে জড়ো হওয়া শ্রমিক-মেহনতি মানুষের শোষণ আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে আন্দোলন, লড়াই, সংগ্রামের ভেতর দিয়ে জন্ম হয় মে দিবসের। ‘দুনিয়ার মজদুর, এক হও-লড়াই করো’ এই শ্লোগানকে ধারণ করেই ১৮৮৬ সালের পর থেকে সারা বিশ্বে ১লা মে পালিত হয়ে আসছে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বা মে দিবস হিসেবে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ঊনিশ শতকের প্রথম দিকে শ্রমিকরা চরম নির্যাতিত, শোষিত হতো, যা অদ্যাবধি অব্যাহত। সপ্তাহের ৬ দিনের প্রতিদিনই গড়ে প্রায় ১২-১৩ ঘন্টা অমানবিকভাবে কাজ করতে হতো কিন্তু তার বিপরীতে পারিশ্রামিক মিলতো খুবই নগন্য। আর প্রত্যেকটি কারখানা বা কাজের ক্ষেত্রগুলোতে স্বাস্থ্যকর কোনো পরিবেশ ছিলো না। প্রতিজন শ্রমিকের জন্যই প্রাপ্য ছিলো রোগ-ব্যাধি, লাঞ্ছনা, মৃত্যু। তাদের পক্ষে কথা বলার মতো ছিলো না কোন ব্যক্তি, ছিলো না কোন শ্রমিক সংগঠন। ১৮৬০ সালে শ্রমিকরাই নিজেদের ক্ষোভ থেকে দাবি জানায়, মুজুরি না কেটে দৈনিক ৮ ঘন্টা কাজ করার কিন্তু মালিক পক্ষ তা উপেক্ষা করে। দাবিটি তেমন জোরালো ছিলো না। এই সময়টাতে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা শ্রমজীবী মানুষের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করতে থাকে। শ্রমিকরা বুঝতে পারে মালিক শ্রেণীর এই রক্ত শোষণ নীতির বিরুদ্ধে তাদের নিজেদের সংঘটিত হওয়া ছাড়া অন্যকোনো বিকল্প নেই। এই চিন্তা থেকেই ১৮৮০-১৮৮১ সালের দিকে শ্রমিক-মেহনতিরা প্রতিষ্ঠা করে Fedaration of Organi“ed Trades and Labor Unions of the United States and Canada পরবর্তীতে (১৮৮৬ সালে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় American Federation of Labor.) এই অর্গানাইজেশনের মাধ্যমে শ্রমিকরা সংগঠিত হতে থাকে ও ১৮৮৪ সালে এই সংঘটি ‘৮ ঘন্টা দৈনিক মুজুরি’ নির্ধারণের প্রস্তাব পাশ করে এবং মালিকপক্ষদের এই প্রস্তাব কার্যকরের জন্য ১লা মে পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়। এই প্রস্তাবটি বাস্তবায়নে সংঘটির আওতাধীন অন্যান্য শ্রমিকদেরও বারবার আহ্বান জানানো হয়।

এই আন্দোলনের প্রথম দিকে মালিক-বণিক শ্রেণীর অনেকেই একটা অবাস্তব অভিলাষ বলে প্রকাশ করে। কিন্তু আস্তে আস্তে শ্রমিকরা সংগঠিত হতে থাকে, প্রতিবাদী হয়ে ওঠে এবং প্রস্তাব বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়। এমন সময়ে আমেরিকার এলার্ম নামক একটি পত্রিকায় ‘একজন শ্রমিক দৈনিক ৮ ঘন্টা কাজ করুক কিংবা ১০ ঘন্টা কাজ করুক, সে তো দাসই’ নামক একটি কলাম লেখা হয় যা পড়ে শ্রমিকরা আরো আন্দোলনমুখী হয়ে ওঠে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর সাথে বিভিন্ন সমাজতন্ত্রপন্থী দল একাত্মতা পোষণ করলে দাবী আদায়ের আল্টিমেটামকে ঘিরে বিভিন্নভাবে প্রতিবাদ, প্রতিরোধের তীব্র আন্দোলনের দানা বাঁধতে থাকে। আর শিকাগো শহর হয়ে ওঠে প্রতিবাদ, প্রতিরোধের এক অগ্নিগর্ভ। ১লা মে-তে শ্রমিকশ্রেণীর যে আল্টিমেটাম ছিলো তা মালিক-বণিক শ্রেণী প্রত্যাখ্যান করে। ১৮৭৭ সালের শ্রমিক শ্রেণী কর্তৃক যে রেলপথ অবরোধ হয়েছিলো সেইটাকে পুলিশ ও ইউনাইটেড স্টেটস আর্মি যে বর্বর আক্রমণ করে মোকাবেলা করেছিলো ঠিক একইভাবে ১৮৮৬ সালের ১লা মে-কে মোকাবেলা করার জন্য এমনই এক রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রস্তুতি নেয় এবং পুলিশ ও জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য বৃদ্ধি করে রাখে। শিকাগো সরকারকে স্থানীয় বণিক-মালিকগণ অস্ত্র সংগ্রহের জন্য আর্থিক সহযোগিতা করে। ১লা মে’র ধর্মঘট ঠেকানোর জন্য ও শ্রমিকদের উপর নির্মম নির্যাতনের জন্য শিকাগো’র বাণিজ্যিক ক্লাব ‘ইলিনয়’ প্রতিরক্ষা বাহিনীকে ২০০০ ডলারের বেশি অর্থ দিয়ে মেশিন গান কিনে দেয়। ন্যায্য দাবী আদায়ে ১লা মে তারিখে পুরো আমেরিকাজুড়ে প্রায় ৩ লাখ শ্রমিক তাদের কাজ বাদ দিয়ে এদিন রাস্তায় নেমে আসে।

শিকাগোতে শ্রমিক ধর্মঘটের আহ্বানে প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক কাজ ফেলে শহরের কেন্দ্রস্থল হে মার্কেটের সামনে জড়ো হয়। থেমে থেমে বক্তৃতা, মিছিল, শ্লোগান, ধর্মঘট, আন্দোলনের বিপ্লবীতাাত্মক অবস্থান সবকিছু মিলে উত্তাল হয়ে উঠে রাজপথ। আগস্ট স্পীজ, পার্সন্স, জোয়ান মোস্ট, লুই লিংসহ আরো অনেকেই শ্রমিকদের মাঝে আন্দোলনের অগ্রজ হয়ে উঠেন। ধীরে ধীরে গোটা শিকাগো শহরে প্রায় ১ লক্ষ শ্রমিক জড়ো হয়ে যায়। আন্দোলনটি বিপ্লবীরূপ নেয় এবং চলতে থাকে। ১৮৮৬ সালের ৪ঠা মে সন্ধ্যার সময় শিকাগো’র হে মার্কেটের সামনে শ্রমিকরা মিছিলের উদ্দেশ্যে একত্রিত হয়। আগষ্ট স্পীজ এই শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা করছিলেন। এই সময় কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ দলের কাছে একটি বোমা বিষ্ফোরিত হয়। এতে ১ জন পুলিশ সদস্য নিহত হয় এবং ১১ জন আহত হয়, পরে আরো ৬ জন মারা যায়। এই ঘটনার আকস্মিকতায় পুলিশবাহিনী শ্রমিকদের উপর লাঠিচার্জসহ বিভিন্ন ধরণের হামলা শুরু করে যা সাথে সাথেই দাঙ্গায় পরিণত হয় এবং রণক্ষেত্রে রূপ নেয়। এতে ১১ জন শ্রমিক শহীদ হয়। পুলিশ হত্যা মামলায় আগস্ট স্পীজসহ ৮ জনকে অভিযুক্ত করে প্রহসনমূলক বিচার শেষে ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর খোলা জায়গায় ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করে তৎকালীন শিকাগো সরকার। আর শ্রমিকদের অগ্রপথিক লুই লিং ১০ নভেম্বর জেলখানায় আত্মাহুতি দেয়, আর অন্য একজনের ১৫ বছর কারাদন্ড হয়। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে অগ্রগণ্য শ্রমিক নেতা আগস্ট স্পীজ বলেন, ‘আজ আমাদের এই নৈঃশব্দ্য, তোমাদের আওয়াজ অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হবে।’ পরবর্তী সময়ে ১৮৯৩ সালের ২৬শে জুন ইলিনয়ের গভর্ণর অভিযুক্ত ৮ জনকেই নিরপরাধ বলে ঘোষণা দেয় এবং দাঙ্গার হুকুম প্রদানকারী পুলিশের কমান্ডারকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। কিন্তু আজো জানা যায় নি, সেদিনের সেই বোমা বিষ্ফোরণকারীর পরিচয়।

১৮৮৬ সালের সেই সকল শ্রমিকদের বীর হিসেবে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়। দেশে দেশে শ্রমিক সংগঠন তথা রাষ্ট্রীয়ভাবেও পালিত হয় মহান মে দিবস। দিবসটিতে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু যাদের জন্য এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে এখনো তারা জানেনা তাদের ন্যায্য অধিকার কি? তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিনা? বাংলাদেশের বাস্তবতায় এখনো শ্রমিকদেরকে শোষণ করা হয়। আইএলও কর্তৃক ঘোষিত শ্রমিকদের জন্য যে কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করার কথা তা আজো বাস্তবায়িত হয়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তর সময়ে শ্রমিকরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে ভূমিকা রাখছে, তা রাষ্ট্র কখনোই স্বীকার করে না। এই পর্যন্ত কারখানাগুলোর দূর্ঘটনায় যতজন শ্রমিক নিহত বা আহত হয়েছেন তারা বা তাদের পরিবার এখনো তার সিকিভাগ সহযোগিতাও পায় না রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষের কাছ থেকে। দেশের সবচেয়ে মারাত্মক পোশাক দুর্ঘটনাটি হয় ২০১৩ সালে রানাপ্লাজার দুর্ঘটনা। এই ঘটনার ৭ বছর পেরিয়ে গেলেও মালিকপক্ষের তেমন কোনো শাস্তি দেখি না। অন্যদিকে যারা নিহত হয়েছিলেন তাদের পরিবারকে ও যারা আহত হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করেছেন তাদের অনেককেই তেমন কোনো আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হয়নি। বেশিরভাগ দূর্ঘটনায় কবলিত শ্রমিকদের ভাগ্যে জোটে না কোন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা বা অনুদান। রাষ্ট্র মালিকপক্ষের ক্ষতি বিবেচনায় তাদের ইন্সুরেন্সের টাকা দিয়ে দেয়।

এই বছর করোনা ভাইরাস এর মহামারীতে দেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিয়ে রাষ্ট্র, বিজিএমইএ ও রক্তচোষা মালিকপক্ষগুলো যে নাটক করছে তাতে বলতেই হয় এখনো আমাদের দেশের শ্রমিকরা আইএলও ঘোষিত যে সুবিধাসমূহ তা পাচ্ছে না। আমাদের দেশের গার্মেন্টসকর্মীদের জন্য করোনা মোকাবেলায় ৫০০০ কোটি টাকার যে প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে তার ছিঁটেফোটাও তারা পাবে কি না সন্দেহ। একদিকে মহামারী আরেকদিকে রোজা এই পরিস্থিতিতে হঠাৎ গার্মেন্টস খুলে দেওয়ায় মহামারীর যে বিস্তার ঘটতেছে সেইটা আমাদের ধারণাতীত। ৩০ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) গার্মেন্টসকর্মীদের বেতন থেকে ৪০% কর্তন করা হবে বলে যে সিদ্ধান্তটা বিজিএমইএ নিলো এইটা কতোটা যৌক্তিক? প্রশ্নটি পাঠকদের জন্য রাখলাম। কৃষি সেক্টরের ২০০০০ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনার কতখানি কৃষি শ্রমিকরা পাবে, ভবিষ্যতেই বলা যাবে। আর পরিবহন সেক্টরসহ অন্যান্য সেক্টরের যে শ্রমিকরা রয়েছে তারাও কর্মহীন এই সময়ে সবচেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। তাদের অবস্থা এখন নুন আনতে পানতা ফুরানোর মতো। করোনাকালীন শ্রমিকদের পরিবেশ, প্রতিবেশ একেবারেই প্রতিকূলে।

আমাদের দেশের শ্রমিকরা প্রতিবছর মে দিবস পালন করলেও মে দিবসের যে ডাক সেটি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। সর্বশেষ, যারা যুগ যুগ ধরে সভ্যতা নির্মাণ করে চলেছেন সেই সকল শ্রমিকদের প্রতি রইলো মহান মে দিবসের ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা এবং ১৮৮৬ সালে যে সকল শ্রমিক অধিকার আদায়ে শহীদ হয়েছিলো তাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক-
ওবায়দুর রহমান
সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী
গৌরীপুর শাখা সংসদ।

আপনার মতামত লিখুন :