যেভাবে জঙ্গি হলেন তারা

গৌরীপুর নিউজ
প্রকাশিত : শনিবার ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১ /

র‌্যাবের অভিযানে ময়মনসিংহের কোতয়ালী থানাধীন খাগডহর এলাকা থেকে অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং বোমা সদৃশ্য বস্তুসহ জেএমবির চারজন সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন- জলুহাস উদ্দিন ওরফে কাদেরী ওরফে মেহেদী (৩৪), মোহাম্মদ রোবায়েদ আলম ওরফে ধ্রু ব ওরফে রুব (৩৩), মোঃ আলাল ওরফে ইসহাক (৪৮) এবং মোঃ আবু আইয়ুব ওরফে খালিদ (৩৬)।

আজ শনিবার দুপুরে র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন র‍্যাব-১৪ ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠা থেকে এ পর্যন্ত ২ হাজার ৬১৭ জন বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদেরকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। এর মধ্যে এক হাজার ৩৭৭ জন জেএমবি সদস্য। র‌্যাবের অভিযনে গ্রেপ্তার হন জেএমবির শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই, আব্দুর রহমানের ভাই আতাউর রহমান সানি, জামাতা আবদুল আউয়ালসহ বেশ কয়েকজন জঙ্গি নেতা। ২০০৭ সালে তাদের ফাঁসি কার্যকর হয়। অতঃপর তেমন কোনো জঙ্গি হামলা সংঘঠিত হয়নি। ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান হামলার মাধ্যমে পুনরায় জঙ্গি সংগঠনের অস্তিত্ব প্রকাশ পায়। হলি আর্টিজান ঘটনা পরবর্তী র‌্যাব জঙ্গিদের গুরুত্বপূর্ণ নেতা, সক্রিয় সদস্য ও হামলার চার্জশিটভূক্ত আসামি গ্রেপ্তারেরও সক্রিয় ছিল।

তিনি আরও বলেন, গোয়েন্দাসূত্রে সাম্প্রতিক ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ ও জামালপুরে জঙ্গিদের বিভিন্ন গতিবিধি নজরে আসে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল মধ্য রাতে র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-১৪ এর অভিযানে ডাকাতির প্রস্তুতির সময় জেএমবির চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।

অভিযানে জব্দ করা হয় একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, ৩ রাউন্ড গোলাবারুদ, ৮টি বোমা সদৃশ্য বস্তু, ৪টি ব্যাগ, দরজা ও লক ব্রেকিং বিভিন্ন সরঞ্জামাদি এবং একটি ইঞ্জিন চালিত নৌকা। গ্রেপ্তারকালীন সময়ে জঙ্গিদের সঙ্গে র‌্যাবের ‘গুলি বিনিময়ের’ ঘটনা ঘটে।

র‍্যাব জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা তাদের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে তথ্য দিয়েছে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবির এহসার সদস্য। এই স্তরের সদস্যরা বিভিন্ন জঙ্গি অপারেশনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে থাকে। আসামিরা সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ডাকাতির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়। এ বিষয়ে জামালপুরের একটি গোপন আস্তানায় বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

গ্রেপ্তারকৃতদের বরাতে র‌্যাব জানায়, সংগঠনে বাছাইকৃত ১০ থেকে ১৫ জনের একটি সংঘবদ্ধ জঙ্গি দল গঠন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ময়মনসিংহের কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, এনজিও, স্বর্ণালঙ্কার দোকান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে একটি টার্গেট নির্ধারণ করেছে। জল ও স্থলপথের সমন্বয় ঘটিয়ে ঘটনাস্থলে আগমনের পরিকল্পনা করা হয়। এক্ষেত্রে পরিকল্পনায় নৌকা, মাইক্রোবাস ও বাইক ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত ছিল। লুটকৃত অর্থ ময়মনসিংহের একটি এলাকার অপর একটি দলের কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা ছিল।

র‍্যাব আরও জানায়, গত ৩১ আগস্ট জামালপুরের মাদারগঞ্জের একটি আস্তানায় তারা জড়ো হয়। পরবর্তীতে পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ১ সেপ্টেম্বর বিকেলে জামালপুরের জামতলা চর এলাকা থেকে ব্রাহ্মপুত্র নদী দিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকাযোগে যাত্রা শুরু করে। গোপনীয়তা বজায় রাখতে পথিমধ্যে তারা বিভিন্ন চরে যাত্রা বিরতি করে। অতঃপর ওই রাতে ব্রাহ্মপুত্র নদী দিয়ে ময়মনসিংহের খাগডহর এলাকায় পৌঁছায়।

তাদের ডাকাতির নেতৃত্বে ছিলেন গ্রেপ্তার জঙ্গি জুলহাস ওরফে কাদেরী ওরফে মেহেদী। তার নেতৃত্বে কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে দায়িত্ব পালনের পরিকল্পনা করেছিল। দলের সদস্যদের ওয়াচম্যান, হাউজ ও লক ব্রেকিং, নিরাপত্তা প্রদান এবং লুটতরাজসহ বিভিন্ন দায়িত্বে বন্টন ও বিভাজন করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত রোবায়েদের সিটিটিভি ও তথ্য প্রযুক্তির বিষয়াদি দেখভাল করার দায়িত্ব ছিল।

৪ জঙ্গি যা করতেন

র‍্যাব জানায়, গ্রেপ্তারকৃত জঙ্গি জুলহাস ওরফে কাদেরী ওরফে মেহেদী ২০০৫ সালে মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ থেকে আলিম পাশ করে। ২০০২ সালে জামালপুরে একটি মাদ্রাসায় দাখিল অধ্যায়ণরত অবস্থায় এক ট্রেইলার মাস্টারের মাধ্যমে জঙ্গিবাদে উদ্ধুদ্ধ হয়। উক্ত টেইলারের দোকানে সে নিয়মিত যাতায়াত করত এবং সেখানে বিভিন্ন উগ্রবাদী ওয়াজ ও গজল শুনত। অতঃপর মুক্তাগাছা একটি মাদ্রাসায় আলিম অধ্যায়ণরত অবস্থায় সে জেএমবিতে যুক্ত হয়। সেসময় মুক্তাগাছার একজন আঞ্চলিক নেতার অধীনে সে বায়াত গ্রহণ করে। উক্ত বায়াত গ্রহণে ১০ জন জেএমবি সদস্য অংশগ্রহণ করে।

উক্ত ১০ জেএমবি সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্বারা গ্রেপ্তারও হয়েছে। কেউ কেউ এখনও আত্মগোপনে রয়েছে। বায়াত প্রদানকারী আঞ্চলিক নেতা বাংলা ভাইয়ের একজন ঘনিষ্ঠ সহচর। উক্ত নেতার মাধ্যমে গ্রেপ্তারকৃত জুলহাসের বাংলা ভাই ও শীর্ষ জঙ্গি নেতা সালাউদ্দিন সালেহীনের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। বাংলা ভাই ও জঙ্গি নেতা সালাউদ্দিন সালেহীন বিভিন্ন সময়ে ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলে অবস্থানকালীন সময়ে বর্ণিত জঙ্গি বিভিন্ন সহায়তা করত।

সে ২০০৭ হতে ২০০৯ সাল পর্যন্ত জঙ্গি সংশ্লিষ্টতায় ২ বছর কারা অন্তরীণ ছিল। অতঃপর সে নিজ এলাকায় জঙ্গিবাদ প্রচারের উদ্দেশ্যে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ও সেখানে শিক্ষকতা শুরু করে। উক্ত মাদ্রাসার দুইজন শিক্ষক জঙ্গিবাদে সংশ্লিষ্টতা থাকায় গ্রেপ্তার হয়। তখন সে সম্ভাব্য গ্রেপ্তার এড়াতে ২০১২ সালে আত্মগোপনে চলে যায়। ফলে মাদ্রাসাটি বন্ধ হয়ে যায়। সে টাঙ্গাইলে ও সিরাজগঞ্জ এলাকায় ছদ্মনামে বিভিন্ন মাদ্রাসা, মসজিদে ইমামতি ও শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত থেকে জঙ্গি কার্যক্রমে সক্রিয় ছিল। এসময় সে জঙ্গিবাদ প্রচার প্রচারণার মাধ্যমে উদ্বৃদ্ধ করণে যুক্ত ছিল। এছাড়া জঙ্গিদের উত্তরবঙ্গ ও ঢাকা গমনাগমনে টাঙ্গাইলে সেল্টার প্রদান করত। পাশাপাশি সে টাঙ্গাইল, গাজীপুর, বগুড়া ও ময়মনসিংহের জঙ্গিদের গোপন আস্তানার সমন্বয় সাধন করত। এমন কয়েকটি আস্তানায় ইতিপূর্বে র‌্যাব অভিযান পরিচালনা করেছে।

গ্রেপ্তারকৃত জঙ্গি রোবায়েদ ওরফে ধ্রুব সম্পর্কে র‍্যাব জানায়, সে ময়মনসিংহের একটি কলেজ থেকে অনার্স সম্পন্ন করে। ময়মনসিংহে অধ্যায়ণরত অবস্থায় এক সহপাঠীর মাধ্যমে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়। অতঃপর সে জেএমবিতে যোগদান করে। ২০১৩ সালে ময়মনসিংহে একটি নাশকতা মামলায় বেশ কয়েকদিন কারা অন্তরীণ ছিল। এছাড়াও সে ২০১৫ সালে ঢাকার একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ইংরেজিতে এমএ সম্পন্ন করে। পরবর্তীতে সে কম্পিউটারের বিভিন্ন প্রোগ্রামের ওপর প্রশিক্ষণ নেয়। সে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ঢাকা ও টেকনাফে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত ছিল। সে শিক্ষকের ছদ্মবেশেও উক্ত এলাকা ও প্রতিষ্ঠানে জঙ্গিবাদ প্রচার করত। সে জেএমবি সাইবার দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। সে করোনাকালীন সময়ে অনলাইন দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করে বেশ কয়েকজনকে জঙ্গিবাদে অন্তর্ভুক্ত করেছে।

গ্রেপ্তারকৃত জঙ্গি আইয়ুব ওরফে খালিদ (৩৬) উত্তরবঙ্গের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি (অনার্স) সম্পন্ন করে। ২০১৯ সালে উত্তরবঙ্গের সাইবার দলের প্রধানের মাধ্যমে জেএমবিতে অন্তর্ভুক্ত হয়। সে উত্তরাঞ্চলের একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে জেএমবি দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়। দ্রুততম সময়ে স্বল্প শিক্ষিতদের জেএমবিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য একটি বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইতিমধ্যে সে পঞ্চগড়, দিনাজপুর ও নীলফামারীতে বেশ কয়েকজন শ্রমিক, অটোচালক, টেইলার ইত্যাদি শ্রেণির পেশাজীবীদের জঙ্গিবাদে অন্তর্ভুক্ত করেছে। উত্তরবঙ্গের উক্ত জেএমবি নেতা তাকে বণির্ত ডাকাতিতে নির্বাচিত করার জন্য শীর্ষ এক নেতার কাছে সুপারিশ করে।

এছাড়া গ্রেপ্তারকৃত জঙ্গি আলাল ওরফে ইসহাক (৪৮) সে ২০১০ সালে জলু হাসের মাধ্যমে জেএমবিতে অন্তর্ভুক্ত হয়। জুলহাসসহ যে দশজন একসঙ্গে জেএমবিতে বায়াত নিয়েছিল, সে তাদের বিশেষ সহযোগী হিসেবে বিভিন্ন সাংগঠনিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করত। সাংগঠনিক প্রয়োজনে সে ময়মনসিংহ, জামালপুর, টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জে সফর করেছে। বর্ণিত ঘটনায় তার নৌকা চালানোসহ ডাকাতিতে অংশগ্রহণের দায়িত্ব ছিল।

আপনার মতামত লিখুন :