রবিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ০৭:৩৪ পূর্বাহ্ন

শিরোনামঃ
ঈশ্বরগঞ্জে প্রতিপক্ষের বল্লমের আঘাতে বালুশ্রমিক নিহত কলমাকান্দায় ওষুধ ব্যবসায়ীর মরদেহ উদ্ধার পেঁয়াজের পর এবার রসুনের দাম ছুঁয়েছে আকাশ বাজারে আসছে ২০০ টাকার নোট রেডিও কিনতে স্ত্রীর গয়না বিক্রি, জাদুঘর গড়ার স্বপ্ন তার ত্রিশালে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে শ্রমিকের মৃত্যু হালুয়াঘাটে বাসচাপায় অটোরিকশার ৪ যাত্রী নিহত শেরপুরে ভাষা দিবসের অনুষ্ঠান দেখতে গিয়ে প্রাণ গেল দুই বন্ধুর গফরগাঁওয়ে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ, বাবা-মেয়ে আহত গফরগাঁওয়ে মায়ের সঙ্গে অভিমান করে শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা ময়মনসিংহে বিনম্র শ্রদ্ধায় পালিত হলো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস গফরগাঁওয়ে ট্রেনের ইঞ্জিনে আগুন, চলাচল বিঘ্নিত প্রয়োজনে কিংবা অপ্রয়োজনে ক্রেতা হয়ে যান তাদের ৫২’র ভাষা আন্দোলনে ময়মনসিংহের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস গৌরীপুরে ৩ বছরেও অন্ধকারে কৃষক আফাজ খুনের রহস্য স্বামী বিদেশ, পরকীয়া প্রেমিকের হাতে প্রাণ গেল অন্তঃসত্তা গৃহবধুর ধোবাউড়ায় বিয়ের প্রলোভনে প্রেমিকাকে চারবন্ধু মিলে ধ’র্ষণ ভাষা শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা প্রস্তুত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ধোবাউড়ায় অটোরিকশার ধাক্কায় স্কুলছাত্রী নিহত

যেসব ছবি তোলার কারণে কোপানো হয় সাংবাদিক সুমনকে

রক্তে ভেসে যাচ্ছে পুরো শরীর। রক্ত লেগেছে হামলাকারীদের গায়েও। প্রায় নিস্তেজ হয়ে মাটিতে পড়ে গেছেন হামলার শিকার যুবক। তবুও এতটুকু মায়া লাগেনি হামলাকারীদের। তারা লাঠি, হকিস্টিক, স্ট্যাম্প, রড দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটাচ্ছিলো। ‘আল্লাহগো, বাঁচাও বাঁচাও, মাগো, বাবাগো..’ বলে চিৎকার করছিলেন যুবক। আশ-পাশে অনেক মানুষ। কেউ ছবি, কেউ ভিডিও ধারণ করছে। তারা কেউ এগিয়ে আসেনি। মৃত্যুর হাত ফসকে ছুটে আসা সেই যুবকের নাম মোস্তাফিজুর রহমান সুমন। তিনি একজন সাংবাদিক।

ঘটনাটি ঘটেছিলো ১লা ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন চলাকালে রায়েরবাজার জাগো ফাউন্ডেশন স্কুল কেন্দ্র সংলগ্ন এলাকায়। সেখানে পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে শঙ্কামুক্ত অনলাইন পোর্টাল আগামী নিউজের ক্রাইম রিপোর্টার মোস্তাফিজুর রহমান সুমন। সে দিনের বর্বরোচিত সেই হামলার কথা স্মরণ হলে এখনও গা শিউরে উঠে তার।

সেদিনের সেই ভয়ঙ্কর হামলার বর্ণনা দিয়েছেন সুমন। অফিসের গাড়িতে করে সকাল ৭টায় বাসা থেকে বের হন তিনি। বিভিন্ন এলাকার ভোট কেন্দ্র ঘুরে মোহাম্মদপুর এলাকায় যেতেই খবর পান ঢাকা উত্তরের ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের রায়েরবাজার জাগো ফাউন্ডেশন স্কুল কেন্দ্র এলাকায় সংঘর্ষ হচ্ছে। দ্রুত সেদিকে যান। গাড়িটি কোনোভাবে সাদেক খান রোড সংলগ্ন গলিতে রেখে নেমে যান সুমন। সশস্ত্র হামলা চলছে। সঙ্গে থাকা এক সহকর্মীর ক্যামেরা দিয়ে কয়েক ছবি তোলেন। পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর দেখে ক্যামেরা রেখে মোবাইলফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছিলেন। পাঁচ-সাত মিনিট পর পুলিশ সদস্যরা এলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু তখনও সশস্ত্র মহড়া দিচ্ছিলো সন্ত্রাসীরা। তারা ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী (বর্তমানে নির্বাচিত) শেখ মোহাম্মদ হোসেন খোকনের টিফিন ক্যারিয়ারের পক্ষে স্লোগান দিচ্ছিলো। হকিস্টিক, রামদা, চাপাতি, ছুরি, রড, লাঠি হাতে মিছিল করতে করতে কেন্দ্রের দিকে যাচ্ছিলো তারা। সেই দৃশ্য মোবাইলফোনে ধারণ করছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান সুমন।

হঠাৎ শ্যামবর্ণের ২০-২২ বছরের এক সশস্ত্র যুবক ক্ষিপ্ত হয়ে এগিয়ে যায়। চিৎকার করে বলে, ‘এই তোর এতো বড় সাহস, ছবি তোললি ক্যান? শালার পো আমাগো চিনিস না। এক্ষুনি কাইট্টা পালামু।’

সুমন কিছু একটা বলছিলেন। কিন্তু তাতে কর্নপাত করেনি তারা। টেনে হিঁচড়ে মিছিলের মধ্যখানে নিয়ে যায়। কিছু বুঝে উঠার আগে গলা বরাবর রামদা দিয়ে কোপ দেয় এক সন্ত্রাসী। তাৎক্ষণিকভাবে সরে যান সুমন। তার ধারণা ওই কোপ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে না পারলে তখনই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হতো তাকে। কিন্তু বর্বরোচিত হামলার এখানেই শুরু। কুপ থেকে রক্ষা পেতেই লোহার রড দিয়ে মাথায় আঘাত করে আরেক সন্ত্রাসী। ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়ে। রক্তে ভেসে যায় সুমনের শরীর। আশপাশের হামলাকারীদের গায়েও লাগে সাংবাদিক সুমনের রক্ত। তখন আরও কয়েক জন মারধরে অংশ নেয়। সুমন নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করছিলেন। তার গলায় ঝুলানো নির্বাচন কমিশনের ‘সাংবাদিক’ লেখা সম্বলিত পাস কার্ডে অস্ত্র ঠেকিয়ে একজন বলতে থাকে, ‘সাম্বাদিক, তোকে কেটে টুকরো টুকরো করে নদীতে ফেলে দেব। আমরা ভাইয়ের লোক, চিনিস না আমাদের, ছবি তোলিস।’ একটু দুর থেকে অভিন্ন আওয়াজ ‘ওরে মার, মেরে ফেল। সাংবাদিক জীবীত রাখলে সমস্যা।’

নির্দেশ পেয়ে রামদা নিয়ে কুপাতে যায় আরেক যুবক। তখন সাংবাদিক লেখা সম্বলিত কার্ড আড়ালে রেখে এগিয়ে যান সুমনের সহকর্মী আজমি আনোয়ার। রামদার সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘কি করছেন, ওকেতো অর্ধেক মেরেই ফেলছেন। আর মারবেন না। ও মারা যাবে।’ হামলাকারী রামদা নিয়ে একটু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। রামদার কুপ থামলেও থামছিলো না কিল, ঘুষি আর লাঠি, হকিস্টিকের আঘাত। দেখতে দেখতে ১০-১৫ জন অংশ নেয় মারধরে। রক্তাক্ত সুমন ততক্ষণে মাটিয়ে লুটিয়ে পড়েন। সহকর্মী আজমি আনোয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেন তাকে রক্ষা করতে। কিন্তু কিছুতেই পারছিলেন না। প্রচন্ড মারে ‘ওরে আল্লাহ, আল্লাহগো বাঁচাও বাঁচাও, মাগো, বাবাগো, ভাইগো আর মারবেন না..।’

এরকম নানা শব্দ উচ্চারণ করে বিলাপ করছিলেন তিনি। চোখে তখন ঝাপসা দেখছিলেন। ধীরে ধীরে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন মোস্তাফিজুর রহমান সুমন। তখনও কেউ কেউ মারছিলো। হুমকি দিচ্ছিলো। সুমন প্রায় নিস্তেজ হয়ে যান। হামলাকারীরা চলে যায়। সহকর্মী দুই সাংবাদিক আজমি আনোয়ার ও সালাহ উদ্দিন জসিম এবং স্থানীয় দুই যুবক তাকে টেনে তোলেন। মাথা থেকে রক্ত বের হচ্ছে, রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করেন তারা। দ্রুত একটি গাড়িতে করে নিয়ে যান পাশের শিকদার মেডিকেলে। পুলিশ কেস বলে চিকিৎসা করতে অনীহা প্রকাশ করেন জরুরি বিভাগের দায়িত্বশীলরা। একপর্যায়ে একজন ডাক্তারের পরামর্শে প্রাথমিক চিকিৎসা করা হয়। তারপর নেয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানেই এখনও চিকিৎসাধীন মোস্তাফিজুর রহমান সুমন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বর্তমানে তিনি শঙ্কামুক্ত রয়েছেন।

মোস্তাফিজুর রহমান সুমন জানান, মারের মধ্যেই তার মানিব্যাগ, অফিসের দেয়া স্যামসং এস ফিফটি মোবাইলফোন কেড়ে নেয় হামলাকারীরা। মারধরের সেই দৃশ্য আশপাশ থেকে ভিডিও ধারণ করেছেন অনেকেই। কিন্তু তারা কেউ সুমনকে রক্ষায় এগিয়ে যাননি। তিনি বলেন, ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শেখ মোহাম্মদ হোসেন খোকনের নির্দেশেই সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা তাকে প্রাণে মারার উদ্দেশ্যে পিটিয়েছে। সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র ছবি, ভিডিও ধারণ করার কারণেই সুমনকে হত্যার নির্দেশ দেন শেখ মোহাম্মদ হোসেন খোকন। হামলার পর ঢামেক হাসপাতালে গিয়ে মামল না করার জন্য হুমকিও দিয়েছেন খোকন।

যদিও কাউন্সিলর শেখ মোহাম্মদ হোসেন খোকন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, যারা হামলা করেছে আমি তাদের চিনিনা। তারা কেউ আমার লোক না। আমি তাকে হুমকিও দেইনি।

ঢাকা উত্তরের ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন খোকনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী লালন-পালন, জবর-দখল, বেপরোয়া চাঁদাবাজিসহ নানারকম দুর্বৃত্তপনার অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চালানোর গোটা সময় একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা কেউ নির্বিঘ্নে প্রচার-প্রচারণা পর্যন্ত চালাতে পারেননি। ভোটের দিনও বেশিরভাগ কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের কোনো এজেন্ট পর্যন্ত ঢুকতে দেওয়া হয়নি। নিজের প্রচার-প্রচারণাসহ ভোটের কাজে আলাদা আলাদা গ্রুপ ছিল মোহাম্মদ হোসেন খোকনের। তার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর গ্রুপের নাম ছিল অ্যাকশন টিম। লাল রঙের পেশাক পরনের এ অ্যাকশন টিম সাজানো হয় স্থানীয় ও বহিরাগত সন্ত্রাসী অস্ত্রবাজদের নিয়ে, এদের বেশিরভাগই ভাড়াটে কিলার হিসেবে চিহ্নিত। অ্যাকশন টিমের ৪০/৪৫ জন সদস্যের সকলেই সর্বদা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত থাকতো।

ঘটনার সময় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মোহাম্মদ হোসেন খোকনের নির্বাচনী কার্যালয়ের দিক থেকে বৃহৎ আকারের একটি লাগেজ নিয়ে অ্যাকশন টিমের লাল পোশাকধারীরা জাফরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের দিকে যেতে থাকে। ওই সময় ভোটকেন্দ্র এলাকায় গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে যে, মোহাম্মদ হোসেন খোকনের পক্ষে সিল মারা লাগেজ বোঝাই ব্যালট ভোটকেন্দ্রে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। বলতে বলতেই কোমরে আগ্নেয়াস্ত্র গোঁজা ও প্রকাশ্যে রামদা উচিয়ে ৩০/৩৫ জনের একটি দল জাফরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের কাছে পৌঁছে যায়। তারা কড়া পাহারায় লাগেজটি নিয়ে ভোটকেন্দ্রের গেটের দিকে যেতে থাকাবস্থায়ই রাস্তার বিপরীত পাশে অবস্থানকারী সাংবাদিক মোস্তাফিজুর রহমান সুমন তার মোবাইল ফোনে একের পর এক ছবি তুলতে থাকেন। কিন্তু বিধি বাম। ছবি তোলার দৃশ্যটি অ্যাকশন টিমের এক সদস্য দেখে ফেলাতেই ওই সাংবাদিকের উপর ভয়াবহ বিপদ নেমে আসে।

জনাকীর্ণ রাস্তায় ধর ধর শব্দে রামদাধারী দৌড়ে এসে সাংবাদিক সুমনকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে রক্তাক্ত করার জঘন্যতায় মেতে উঠে। তাদের কোপানো শেষে রাস্তায় পড়ে থাকা সুমনের মৃত্যু নিশ্চিত করতেই ছুটে আসে ক্রিকেটের স্ট্যাম্পধারী আরেকটি গ্রুপ। তারাও কয়েক মিনিট ধরে শেয়াল কুকুরের মতো নির্মমভাবে পিটিয়ে সুমনের নীরব নিথর দেহটি রাস্তার ধারে লাথি মেরে ফেলে রেখে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, এ সময় কাউন্সিলর প্রার্থী মোহাম্মদ হোসেন খোকন নিজেও জাফরাবাদ কেন্দ্রেই উপস্থিত ছিলেন। সাংবাদিকের উপর হামলা চালানো লাগেজ বহনকারী দুর্বৃত্তরা কেন্দ্রের ভেতরে ঢুকেই তাকে বিস্তারিত জানায় এবং তিনি দ্রুতগতিতে পরিস্থিতি ধামাচাপা দেয়ার উদ্যোগ নেন। ফলে কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পর্যন্ত ঘটনাস্থলের দিকে আর এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনবোধ করেননি-তারা ব্যস্ত ছিলেন মোহাম্মদ হোসেন খোকনের ব্রিফিং শোনার কাজে।

গুরুতর আহত সাংবাদিক মোস্তাফিজুর রহমান সুমনের গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরা। তিনি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) ও ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য। তাকে হত্যা চেষ্টার ঘটনার প্রতিবাদে সাংবাদিকরা প্রতিবাদ সভা, মানববন্ধনসহ নানা আন্দোলন কর্মসূচি শুরু করলেও পুলিশ এখন পর্যন্ত হামলাকারী দুর্বৃত্তদের কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

কপিরাইট © গৌরীপুর নিউজ ডট কম ২০২০
Design & Developed BY A K Mahfuzur Rahman