রানা প্লাজা ধস: বাঁচার জন্য রোজিনা নিজেই নিজের হাত কাটেন

গৌরীপুর নিউজ
প্রকাশিত : বুধবার ২৪ এপ্রিল, ২০১৯ /

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিলের ঘটনা। এ ঘটনার ৬ বছর পূর্ণ হলো আজ। কিন্তু নিহতদের স্বজন ও আহতদের চোখের পানি মুছতে পারেনি কেউ। সেদিনের সেই ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে আজও আঁতকে ওঠেন রোজিনা বেগম।

ওরা দুই বোন। রোজিনা বেগম ও মর্জিনা আক্তার। দু’জনেই জীবিকার তাগিদে কাজ করতেন রাজধানীর সাভারের রানাপ্লাজার একটি পোশাক কারখানায়। শত কষ্টের মাঝেও তাদের সংসার গোছানোর স্বপ্নটা অল্প অল্প করে এগোচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই সেই স্বপ্নের মৃত্যু ঘটে ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকালে। রানাপ্লাজা ধসের ঘটনায় মর্জিনার মৃত্যু হয়। আর ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে তিনদিন পর নিজেই নিজের হাত কেটে বেরিয়ে আসেন রোজিনা।

রোজিনার বাড়ি ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের গাজীপুর গ্রামে। তার বাবার নাম ছফুর উদ্দিন। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে রোজিনা সবার বড়। রানাপ্লাজার দুর্ঘটনার পর রোজিনা বিভিন্ন সংস্থার দেয়া অনুদানের টাকায় নিজ গ্রাম গৌরীপুরের গাজীপুর বাজারের পাশে জমি কিনে নতুন বাড়ি নির্মাণ করে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। তার স্বামী সাইদুল ইসলাম পেশায় ভ্যান চালক। বড় মেয়ে রিমি আক্তার স্থানীয় একটি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। ছোট মেয়ে সাদিয়া আক্তারের বয়স চার বছর।

মঙ্গলবার (২৩ এপ্রিল) নিজ গ্রামের বাড়িতে বসেই রানাপ্লাজার ভবনধসের দুর্বিষহ ঘটনা এ প্রতিবেদকের কাছে তুলে ধরেন রোজিনা। তিনি বলেন, ‘রানাপ্লাজার ভবনে ফাটল দেখা দেয়ায় সেদিন (২৪ এপ্রিল ২০১৩) সকালে গার্মেন্টস কর্মীরা ভেতরে ঢুকতে চাচ্ছিল না। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সকাল ৮টার শিফটে আমাদের জোর করে কারখানায় নিয়ে যায়। ওইদিন পৌনে ৯টার সময় আমার মেশিনের পাশের একটি পিলার ভেঙে পড়তে শুরু করে। শুরু হয় শ্রমিকদের চিৎকার আর আর্তনাদ। বের হওয়ার জন্য যে যার মতো ছুটছে। এরপর আর কোনো কিছুই মনে নেই।’

রোজিনা বলেন, ‘জ্ঞান ফেরার পর চোখ মেলেই দেখি অন্ধকার। দিন না রাত বুঝতে পারছিলাম না। তবে মানুষের চিৎকার আর মাইকের শব্দ পাচ্ছিলাম। এক সময় টর্চ লাইটের আলো দেখতে পেলাম। কিন্তু গলা শুকিয়ে যাওয়ায় কথা বলতে পারছিলাম না। পানির পিপাসায় বুক ফেটে যাচ্ছিল। বাম হাতটা আটকে গিয়েছিল পিলারের নিচে। কোমরে রড ঢুকেছে। পা দুটো চাপা পড়েছে মেশিনের নিচে। সামান্য নড়াচড়াও করা যাচ্ছিল না।’

তিনি আরও বলেন, ‘উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আমাকে বের করে আনার অনেক চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়। একজন চিকিৎসক দূর থেকে আমার সঙ্গে কথা বলে শারীরিক অবস্থা জানেন। দ্বিতীয় দিন রাতে চিকিৎসক আমাকে প্রস্তাব দেন নিজে নিজে বাম হাত কেটে বের হয়ে আসতে। কিছুতেই সেই সাহস করতে পারছিলাম না। পরে জীবন বাঁচাতে হাত কাটার সিদ্ধান্ত নেই। চিকিৎসকের শিখিয়ে দেওয়া পদ্ধতিতে তৃতীয় দিন দুপুরে বিশেষ ব্লেড দিয়ে নিজেই নিজের বাম হাত কেটে বের হই ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে। এরপর সিএমএইচ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সিআরপিতে ৭ মাস চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হই। ধ্বংসস্তূপে চাপা থাকার সময় বারবার মনে হচ্ছিল ছোট বোন মর্জিনার কথা। পরে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে জানতে পারি মর্জিনা ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে মারা গেছে।’

জানা গেছে, দুর্ঘটনার পর রোজিনার বাসস্থানের নিশ্চয়তা হলেও জীবিকার নিশ্চয়তা হয়নি। স্বামীর ভ্যানগাড়ি চালানোর আয়ে সংসার চলে না। হাত হারালেও প্রতিবন্ধী ভাতা ভাগ্যে জোটেনি। গত দুই বছরে নিজের চিকিৎসা করাতে গিয়ে কয়েক লাখ টাকা ঋণ হয়েছেন। মাঝে মাঝে না খেয়েও থাকতে হয়।

রোজিনা আক্তার বলেন, ‘প্রথমদিকে সরকার থেকে ১০ হাজার টাকা ভাতা পেলেও এখন সেটা কমে সাড়ে ৮ হাজার হয়েছে। অভাবের তাড়নায় স্কুলে মেয়ের চার মাসের বেতন আটকা। একবার ঢাকার এক সাংবাদিক বলেছিল সন্তানের পড়াশোনার খরচ দেবে। কিন্তু পরে আর দেয় নাই।’

রোজিনার সঙ্গে গল্প করতে করতে সকালের বেলা দুপুরে গড়িয়েছে। তেজ ছড়াতে শুরু করেছে দুপুরের রোদ। এমন সময় আগমন ঘটে রোজিনার স্বামী সাইদুল ইসলামের। তিনি বলেন, ‘রানাপ্লাজা আমাদের জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে। তাই আমি চাই না আমার সন্তান গার্মেন্টসে কাজ করুক। কিন্তু অভাবের তাড়নায় প্রায়ই পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকতে হচ্ছে। তাই সন্তানের পড়াশোনার খরচ ও স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য সরকারের কাছে আকুতি জানাচ্ছি।’

স্বামীর কথার রেশ টেনে রোজিনা বলেন, ‘তুমি ঠিক কথাই বলছ। অভাবের সংসারে নিজেরা লবণ দিয়ে ভাত খেলেও কষ্ট হবে না। নিজের চিকিৎসার কথা না হয় বাদই দিলাম, কিন্তু সন্তানদের পড়াশোনা করাতে অনেক টাকা লাগবে। আমরা এতো টাকা কোথায় পাব? সাহায্যের আকুতিটা সরকারের কাছে পৌঁছাবে তো?’

আপনার মতামত লিখুন :