রেডিও কিনতে স্ত্রীর গয়না বিক্রি, জাদুঘর গড়ার স্বপ্ন তার

গৌরীপুর নিউজ
প্রকাশিত : শনিবার ২২ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ /

শখ পূরণ করতে মানুষ অনেক কিছুই করে থাকে। তাই তো বলা হয় যে, শখের তোলা লাখ টাকা। শখ করে মানুষ বাড়ি করে, গাড়ি কেনে, বাগান করে। তবে কখনো কি শুনেছেন, শখ করে কেউ পুরনো যুগের রেডিও সংগ্রহ করে। শখের রেডিও মিউজিয়াম তৈরি করে। মোফাজ্জল হোসেন নামক এক ব্যক্তি ১৯৭১ সাল থেকে করছেন পুরাতন রেডিও সংগ্রহ।

তার স্বপ্ন একটাই, রেডিও জাদুঘর গড়া। যেখানে থাকবে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কার ব্যবহৃত সব রেডিও। আরো থাকবে, পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হাজারো রেডিওর সমাহার। সেই রেডিও জাদুঘর হবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রেডিও জাদুঘর। এসব রেডিও নিয়ে গবেষণা করবে আগামীর প্রজন্ম।

মোফাজ্জল হোসেনের বাড়ি ময়মনসিংহের কোতোয়ালি থানার আকুয়া গ্রামে। বাবা আবদুল ফারুক ছিলেন রেডিও মেকানিক। রেডিও সারাইয়ের দোকান ছিল তার। তার বড় পরিচয় তিনি ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। ২০১৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি, বাংলাদেশ বেতার ভবনে বিশ্ব বেতার দিবসে মোফাজ্জলের সংগ্রহে থাকা ৮০০ থেকে এক হাজার রেডিওর বিশেষ প্রদর্শনী করা হয়।

মোফাজ্জল হোসেন পেশায় একজন ঘড়ি মেকানিক। নামী দামী ব্র্যান্ডের ঘড়ি বিক্রি করেন তিনি। তবে তার নেশা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রেডিও সংগ্রহ করা। রেডিওই যেনো তার ধ্যান-জ্ঞান। তবে বিয়ের পর মোফাজ্জলের রেডিও সংগ্রহে পাগলপারা ভাব দেখে স্ত্রী তাকে পাগল ভেবেছিলেন। তবে এখন বোঝেন, তার স্বামী একটি ভালো কাজ নীরবে করে চলেছেন। রেডিও কিনতে স্ত্রীর সোনার গয়নাও বিক্রি করেছেন মোফাজ্জলকে।

রেডিও সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক রকম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। টাকার অভাবে কখনো জুতা বিক্রি করেও রেডিও কিনেছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রেডিও কিনতে গেছেন। টাকার কমতি পড়লে দিনমজুরিও করেছেন নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জোগাড় করার জন্য। এমন অনেক অভিজ্ঞতাই রয়েছে তার ঝুলিতে। কখনো থেমে যায়নি তার পথচলা, থেমে থাকেনি রেডিও সংগ্রহ। আজো তিনি চলছেন অবিরত।

কীভাবে শুরু হয় তার পথচলা? তার বাবা যেহেতু মুক্তিযোদ্ধা, তাই তার দোকানে সহযোদ্ধারা আসতেন, গল্প করতেন। সেই সূত্রে তিনি জানতে পারেন, রেডিও নামের যন্ত্রটি বিনোদন ও খবরাখবর শোনার মাধ্যম। তবে সারা বিশ্বের মানুষের কাছে তা হলেও বাংলাদেশের মানুষের কাছে এর রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। প্রথমত এর আবিষ্কারের সঙ্গে রয়েছে একজন কৃতী বাঙালি স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর নাম।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মে রয়েছে রেডিওর বিশেষ ভূমিকা। মুক্তিযুদ্ধকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান রেডিওতে শুনে আশাবাদী হতো বাঙালি। যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছে এখান থেকেই। অপারেশন জ্যাকপটের কথাও জানাতে পারেন তিনি। চট্টগ্রাম নৌবন্দরে মুক্তিযোদ্ধারা অপারেশন চালিয়েছিলেন কলকাতা বেতার থেকে প্রচারিত একটি গানের সংকেতে। সংকেত তাদের আগেই দিয়ে দেয়া হয়েছিল।

একসময় জীবনের তাগিদে ময়মনসিংহ থেকে তিনি চলে আসেন রাজধানী ঢাকায়। রেডিও সংগ্রহ তার নেশা হওয়ার কারণে পড়াশোনায় প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেননি মোফাজ্জল। তবে এ নিয়ে তার ভাষ্য, রেডিও আমাকে অনেক শিক্ষা দিয়েছে। রেডিওই আমার পড়াশুনা। আমি যদি পড়াশুনা করতাম, তবে আজ হাজারটি রেডিও আমার সংগ্রহে থাকতো না।

মোফাজ্জল হোসেন বলেন, মানব সভ্যতার ইতিহাসে রেডিও যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছে। একসময় বিনোদন ও দেশ-বিদেশের খবর শোনার প্রধান মাধ্যম ছিল রেডিও। যার বাড়িতে রেডিও থাকত তাকে মানুষ গুরুত্ব দিত। আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তির কারণে এখন রেডিওর ব্যবহার কমে এসেছে। তবে এর অবদান কখনো ম্লান হবে না।

মোফাজ্জল নিজের সংগ্রহকে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিতে চান। তিনি একটি রেডিও জাদুঘর গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন। সেটির নাম হবে স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর নামে। তিনিই তো রেডিওর আবিষ্কারক। জাদুঘরের স্থাপনা হবে রেডিওর আকৃতিতে। জাদুঘরে রাখা বিভিন্ন রেডিও উৎসাহী দর্শকরা বাজিয়েও শুনতে পারবে। নতুন প্রজন্ম এই জাদুঘরে এসে জানতে পারবে রেডিওর ইতিহাস। সেইসঙ্গে জানবে মানব সভ্যতায় ও মুক্তিযুদ্ধে রেডিওর অবদান। এ স্বপ্নেই বিভোর তিনি। স্বপ্ন পূরণের জন্য সহায়তার আশায় তিনি ছুটছেন দ্বারে দ্বারে।

মোফাজ্জলের দুই ছেলে, এক মেয়ে। আগে ঘড়ি মেরামতের দোকান ছিল। এখন ডা. ইসহাক ইমামের সংগৃহীত অ্যান্টিক ঘড়িগুলোর দেখাশোনা করেন। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যেমন ভাবেন, তেমনি রেডিওগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও চিন্তিত তিনি। সারা জীবন কষ্ট করে রেডিও সংগ্রহ করছি। এখন জায়গার অভাবে ঠিকমতো রাখতে পারি না।

এত দামি দামি জিনিস চোরে নিয়ে যায় কি না, ভেবে রাতে ঘুমও হয় না। আমি এখন এই দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি চাই। কেউ যদি সবগুলো রেডিও যত্ন করে রাখবে বলে কথা দিত, তাকে দিয়ে দিতাম। মোফাজ্জল জানান, তার স্বপ্ন রেডিওগুলো নিয়ে একটা জাদুঘর করার। সেখানে রেডিও নিয়ে গবেষণা হবে। নতুন প্রজন্ম ইতিহাস জানবে।

সূত্র- বিবিসি বাংলা

আপনার মতামত লিখুন :