সাইকেল বালিকাদের স্কুল

উপজেলা প্রতিনিধি
প্রকাশিত : শুক্রবার ১৬ অক্টোবর, ২০২০ /

পিচঢালা কোনো সড়ক নেই গ্রামটিতে। পুরোটাই আঁকাবাঁকা, উঁচু-নিচু মেঠোপথ। এই পথ দিয়েই প্রতিদিন সাইকেলে ছুটছে একদল বালিকা। চোখে রাজ্যের স্বপ্ন, মনে আত্মবিশ্বাস। পরনে গাঢ় আকাশি ও সাদা রঙের স্কুল ড্রেস।

বলছিলাম ময়নসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার কালাদহ ইউপির নিশিন্দার পাড়ের শিবরামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ‘সাইকেল বালিকাদের’ কথা। সবার কাছেই স্কুলটি এখন ‘সাইকেল বালিকাদের স্কুল’ নামেও পরিচিত।

কাঁধে বইয়ের ব্যাগ, অমলিন হাসি নিয়ে প্যাডেল মেরে এক থেকে পাঁচ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে স্কুলে পৌঁছায়। প্রখর রোদ, বৃষ্টি, তীব্র শীত দমিয়ে রাখতে পারে না দূরন্ত ‘সাইকেল বালিকাদের’। মেয়েদের শিক্ষিত হওয়ার এ লড়াই-সংগ্রামের নেপথ্যে থেকে উৎসাহ দিচ্ছেন শিবরামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। শুধু মেয়েদের সাহসী করাই নয়, লেখাপড়াতেও দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে প্রত্যন্ত গ্রামের এ আলোর বাতিঘরটি। জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় ফলাফলে ব্যাপক সফলতা রয়েছে বিদ্যালয়টির। গত পাঁচ বছরে এই স্কুল থেকে জেএসসি পরীক্ষায় ১৫১ জন জিপিএ-৫ ও ৯৮ শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পায়।

স্কুল পরিচিতি

ফুলবাড়িয়া উপজেলার ছোট্র গ্রাম শিবরামপুর। এ গ্রামেই ১৯৬৭ সালে মরহুম নিরাজ আলী সরকার ও মৌলভী ওয়াহেদ আলী প্রতিষ্ঠা করেন ‘শিবরামপুর উচ্চ বিদ্যালয়’। ৩.৭২ শতাংশ জমি উপর এখন দাঁড়িয়ে এই শিক্ষাঙ্গন। চারদিকে সবুজের ঘেরা, রয়েছে বিশাল খেলার মাঠ। শিক্ষার্থী সংখ্যা সাড়ে ছয় শতাধিক। ছাত্রী সাড়ে তিন শতাধিক, প্রায় সবাই সাইকেল চালিয়ে আসে। ছেলেরাও সাইকেল নিয়ে যাতায়াত করে।

বাইসাইকেল যাত্রা যেভাবে শুরু

নাম দিপা দেবনাথ। সময়টা ২০০৬। দিপা তখন সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া। বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার। রিকশা অথবা ভ্যানে সঠিক সময়ে স্কুলে পৌঁছানো অনেকটা দুষ্কর। বড় ভাইয়ের সাইকেলটি দেখে তারও মনে হয় সেও সাইকেল চেপে স্কুলে যেতে পারে। বাইসাইকেলের জন্য আবদার করেন দাদু সুরেন্দ্র চন্দ্র দেবনাথের কাছে। তবে প্রথমে তিনি সাইকেল কিনে দিতে অস্বীকার করলেও পরে ঠিকই কিনে দেন। সেই থেকে শুরু। পরে তার দলে ধীরে ধীরে যোগ হয় ঝরা, স্মৃতি, আকলিমা, সুইটিসহ পাঁচ থেকে সাত বান্ধবী। এখন এর সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিনশ। আর আলোক বাতি দিপা দেবনাথ এখন রাজশাহী মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের ছাত্রী। পরে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ও শিক্ষকরা অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেন এ বিদ্যালয়ে ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও সাইকেল চালিয়ে স্কুলে আসবে। প্রথমদিকে অনেক অভিভাবক এ সিদ্ধান্তের বিরোধী ছিলেন। মেয়েদের সাইকেল যাত্রা দেখে বখাটেরা হাসিঠাট্টাও করতো। সব উপেক্ষা করে সাইকেল চালিয়ে স্কুলে আসা অব্যাহত রাখে মেয়েরা।

তৈরি হয়েছে অনেক দিপা

এক দিপা দেবনাথকে অনুকরণ করে দেশের স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিবরামপুর বিদ্যালয়ের মেয়েরা পড়াশুনা করছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্ত্বেরের আফসানা ইয়াসমিন সুইটি ও চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আফরিনা ইয়াসমিন সুমা, বাংলাদেশ প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্রী ফারজানা ইয়াসমিন শিফাও এক সময় ওই স্কুলের ‘সাইকেল বালিকা ছিলেন’।

অভিভাবকদের কথা:

অষ্টম শ্রেণির সাদিয়া আফরিন স্মৃতির বাবা আব্দুল মোতালব জানান, বাইসাইকেলে চেপে স্কুলে যাতায়াতের সুফল পাচ্ছেন সবাই। মেয়েরা যেমন সময় মতো স্কুলে পৌঁছতে পারছে তেমনই যানবাহনের জন্য রাস্তাঘাটে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। অভিভাবকদের মানসিকতা বদলেছে। শিবরামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেই মেয়েদের সাইকেল কিনে দিচ্ছেন।

প্রধান শিক্ষকের বয়ান

প্রধান শিক্ষক আফসার আলী বলেন, একসময় মেয়েদের প্রতি পরিবারের একটা বিরূপ আচরণ ছিল। এখন আর তা নেই। মেয়েদের সফলতাই তাদের এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এখন ৯৫ ভাগ মেয়েই সাইকেল নিয়ে স্কুলে আসে। তবে শুরুর দিকে এলাকার ছেলেরা নানাভাবে উক্ত্যক্ত করতো। বিষয়গুলো শিক্ষকরা অভিভাবকদের নিয়ে প্রতিবাদ করায় ধীরে ধীরে এসব বন্ধ হয়ে যায়।

আপনার মতামত লিখুন :