স্বাদে গন্ধে অতুলনীয়, খেতে সুস্বাদ ঐতিহ্যবাহী মঙ্গলবাড়ীয়া লিচু

জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশিত : সোমবার ২০ মে, ২০১৯ /

রসে টইটুম্বুর। স্বাদে গন্ধে অতুলনীয়, খেতে সুস্বাদু। আকারে বড়। বাতাসের তালে, গাছের পাতার ফাঁকে লাল হয়ে দুলছে আর দুলছে। দেখে যেন জিভে জল এসে যায়। দেখেই মন চায় খেতে। হ্যাঁ, পাঠক এমনই লিচুর আবাদ হয়ে থাকে কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলার মঙ্গলবাড়ীয়া গ্রামে। যে লিচুর স্বাদ নেওয়ার জন্য রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার লোকজন ভিড় জমাচ্ছেন ওই গ্রামটিতে। এমনকি দেশের ভিভিআইপি’র ঘরেও পৌঁছে এই লিচু। যায় দেশের বাইরেও। দেশের অন্যতম ও সুনাম ধন্য লিচুর নাম মঙ্গলবাড়ীয়া লিচু।

দেশে তো অনেক লিচু আছে, তবে এখানকার লিচুর মত নয়। যার স্বাদ ও রুচির তুলনা করা যায় না। যে খেয়েছে কেবল শুধু সেই এই লিচুর স্বাদ গ্রহণ করেছে। এই লিচু খেতে যেমন সুস্বাদু তেমনি তার গঠনপ্রণালীও। তাই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে, প্রশাসনিক, রাজনৈতিক, ঢাকা ও সিলেটে ব্যক্তিবর্গ সহ স্থানীয় লোকদের ভিড় লেগেই থাকে সারাক্ষণ। অনেক দর্শনার্থী দূর দূরান্ত থেকে এই লিচু দেখতে আসে এবং ক্রয় করে নিয়ে যায়। অনেকেই আসে লিচু গছের সঙ্গে সেলফি তুলার জন্যও। এতো সুন্দর ও সুস্বাদু লিচু যেন দেখতেই ইচ্ছে করে সারাক্ষণ আর খেতেও।

এই বছরে লিচুর বাম্পার ফলন হওয়ায় চাষিদের মুখেও রয়েছে হাসি। অল্প খরচেই অনেক টাকা লাভবান হচ্ছে তারা। শুধু একটু দেখা-শোনা ও খেয়াল রাখতে হয় তাদের। গাছে মুকুল ধরার আগেই কীটনাশক ওষুধ স্প্রে করতে হয় তাদের। মুকুল গজানোর পূর্বে ও পরে কিছু দিন পর পর ধারাবাহিক ভাবে তিন মাসে সাত বার ড্রেসিস ও শিখো এবং পানপিস ও ড্রেসিস স্প্রে করে থাকে। তবেই কীটনাশক থেকে রক্ষা পাওয়ায় বাম্পার ফলনের উৎপাদক সম্ভব হয়ে উঠে। দিনে ও রাতে পরিশ্রম করে এই বাম্পার ফলন ও সুস্বাদু লিচু ফলাতে হয় তাদের। প্রতি রাত ও দিনের জন্য একজন প্রহরী বাবদ চারশত টাকা গুনতে হয় তাদেরকে। কোন চাষির ৩০ জন কোন চাষির ২০ জন বা ১০ জন করে প্রহরী রাখতে হচ্ছে নিরাপত্তার জন্য। তবুও এই তিন মাসের ফলনে অধিক অঙ্কের টাকা লাভবান হতে পারচ্ছে চাষিরা। শুধু কৃষকগোষ্ঠীই নয় বরং স্কুল-কলেজ ও মাদরাসার অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরাও এই ব্যবসায় মনোনিবেশ হয়েছে এবং অল্প খরচেই অধিক টাকা উপার্জন করছে তাদের শ্রমের মাধ্যমে।

তাদের মত ওই গ্রামের তৌহিদ ব্যাপারী (৬৫)। তিনি পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ড মঙ্গলবাড়ীয়া মুন্সি বাড়ির বাসিন্দা। তিনি ৬টা বাগে মোট ৬০টি গাছে লিচু চাষ করেছে। চলতি বছরে তিনি এগারোটি লিচু গাছ ষাট হাজার টাকা এবং বাকিগুলো চার ও পাঁচ হাজার টাকা করে গাছের মালিকের কাছ থেকে ক্রয় করেছে। এই বছর ৬০টি গাছে তিন লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে তার। এই গাছগুলোতে লিচু চাষ করে বর্তমানে প্রতি একশ লিচু চারশ’-পাঁচশ’ টাকা করে বিক্রি করছে। তার লিচু কিনার জন্যে ঢাকা, সিলেট ও প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গ সহ রাজনৈতিক এবং স্থানীয় জনতা প্রতিদিন ভিড় জমায়।

মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামের আর একজন সফল লিচু চাষি মো: শামসুদ্দিন। লিচুর আয় থেকে সংসার চালিয়েও ৫ মেয়েকে উচ্চ শিক্ষিত করে বিয়ে দিয়েছেন। মানুষ করেছেন, ৩ ছেলেকে। এখন তার চোখে-মুখে তৃপ্তির হাসি। বর্তমানে তার মালিকানায় রয়েছে বিশালাকৃতির ৬৫টি লিচু গাছ। প্রতি মৌসুমে ৫ থেকে ৮ লাখ টাকার লিচু বিক্রি করেন। তিনি আরো জানালেন, লিচু গাছগুলো তার রোজগারক্ষম ছেলের চেয়েও বেশি উপকারী। লিচু চাষ করে তার যে আয় হয়, তা বছরে ১০ একর জমিতে উৎপাদিত ধানের চেয়ে বেশি।

এছাড়াও এই গ্রামে হেলাল উদ্দিন (৬৫), রুহুল আমিন (৪৫), জিল্লুর রহমান (৫৫), মহর উদ্দিন (৬৫), মাসুদ (৭০), সেনু (৪০), শামসু মেম্বার (৬৫) , বাচ্ছু মিয়া (৬০) ও মহসিন (৫০) এর লিচুর ব্যবসায়ী রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে পুরাতন ব্যবসায়ী তওহিদ। তিনি প্রায় চল্লিশ বছর যাবৎ এই ব্যবসার সাথে জড়িত রয়েছেন। আর অন্যান্যরা কেউ পনেরো বছর আবার কেউ তিন বছর ধরে লিচু ব্যবসার সাথে জড়িত রয়েছেন।

হেলাল উদ্দিন জানান, আমি চল্লিশটি গাছে লিচু চাষ করেছি তার মধ্যে সতেরোটি গাছ পঁচাশি হাজার টাকায় ক্রয় করেছি এবং বিশ হাজার টাকা গাছের পিছনে খরচ করেছি। আমি পনেরো বছর ধরে এই ব্যবসায় রয়েছি। আশা করছি অন্যান্য বছরের মত এবারও লিচু বিক্রি করে লাভবান হতে পারবো।

একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আরাফাত রহমান নাদিম (১৭) জানায়, এই বছরে আমি সোয়া ১ লাখ টাকার লিচু বিক্রি করেছি।

খন্দকার মুখলেছুর রহমান (৭৫) জানান, আমি ১৯৭৫ সন থেকে লিচু ব্যবসার সাথে জড়িত হয়েছি। এবং এই ব্যবসায় আমি লাভবান হয়েছি।

এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী মো: জুবায়ের হোসেন তামিম (১৭) জানায়, আমি নিজেও এই ব্যবসার সাথে যুক্ত হয়ে ত্রিশ হাজার লিচু খুচরা বিক্রি করেছি। ৩২০টি গাছ দশজন মিলে ৩০ লাখ টাকা দিয়ে গাছগুলো ক্রয় করেছি। পরিবার এবং পোল্ট্রি ও মৎস ব্যবসায়ী খন্দকার মো: তারিফুল ইসলাম নওফেল (২৮) এর সহয়তায় সবাই মিলে গাছগুলো কিনেছি। আমাদের সাথে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আলবাব জামান মুফরাতও (১৭) রয়েছে।

স্থানীয় তানভীর আহমেদ (১৭) জানায়, আমার একটা গাছে আটশত লিচু হয়েছে এর মধ্যে নিজেরা খেয়ে এবং আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে দিয়েও অনেক লিচু বাজারে বিক্রি করেছি।

পাকুন্দিয়া মঙ্গলবাড়ীয়া এলাকায় জেলার হাওর অঞ্চল মিঠামইন থেকে ঘুরতে আসা ১৮ বছর বয়সী আমানউল্লাহ’র সাথে কথা বললে তিনি জানান, আমি এই এলাকার লিচুর নাম অনেক শুনেছি। আজ তা বাস্তবে দেখতে আসলাম এবং খেতে আসলাম।

তিনি আরও বলেন, আমি এই জায়গায় এসে অনেক আনন্দ পেয়েছি। সবচেয়ে বেশি আানন্দ পেয়েছি যে আমি গাছে উঠে নিজ হাতে লিচু খেতে পেরেছি। শুধু খাইনি আমার বাসার জন্যও নিয়েছি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ব্রিটিশ আমলে এ গ্রামের জনৈক দারোগা সদূর চীন থেকে এই জাতের লিচু সর্বপ্রথম রোপণ করেন। এরপর থেকে এ লিচুর স্বাদ, গন্ধ, সুস্বাদু দেখে পুরো মঙ্গলবাড়ীয়া গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে লিচু চাষ। এ গ্রামের অনেকেই লিচু চাষে এখন স্বাবলম্বী। গ্রামের প্রায় শতাধিক লিচু চাষির সহস্রাধিক লিচু গাছ রয়েছে। এক কথায় বলতে গেলে, মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামের প্রত্যেক বাড়িতেই কমবেশি লিচু গাছ রয়েছে। দিনদিন এর ব্যাপকতা বেড়েই চলছে।

মঙ্গলবাড়ীয়া গ্রামের লিচুর সঠিক জাত জানা সম্ভব হয়নি। তবে গ্রামের নামানুসারে একে ‘মঙ্গলবাড়ীয়ার ঐতিহ্যবাহী’ লিচু বলে দেশে খ্যাতি অর্জন করেছে।

এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, মঙ্গল শাহ নামে এক ব্যক্তি এই এলাকায় বাস করত আর সেই থেকেই এই এলাকার নামকরণ করা হয় মঙ্গলবাড়ীয়া।

তবে মাহে রমজান উপলক্ষে পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্রেতা না পাওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন তারা।

আপনার মতামত লিখুন :