দৌলতদিয়া যৌনপল্লী

সৎকার হতনা পতিতাদের, কলসি বেধেঁ ডুবিয়ে দেয়া হত !

প্রকাশিত: ১১:০৬ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২০

দেশের সর্ববৃহৎ পতিতাপল্লী রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া যৌনপল্লী । এখানকার নারীরা যুগ যুগ ধরে অন্তহীন কষ্ট, গ্লানি, দুঃখ ও যন্ত্রণা, সামাজিক অবহেলা এবং নিষ্ঠুর আচরণের শিকার হয়ে অমানবিক জীবন যাপন করে আসছিলেন । সম্প্রতি ঢাকা রেঞ্জ পুলিশের ডিআইজি হাবিবুর রহমান , রাজবাড়ী জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমানের নির্দেশনায় এবং গোয়ালন্দ ঘাট থানার ওসি আশিকুর রহমানের হস্তক্ষেপে দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর নারীদের ও শিশুদের ভাগ্যের পরির্বতনের ছোঁয়া লেগেছে ।

জানা যায়, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া পতিতাপল্লী দেশের সর্ববৃহৎ পতিতাপল্লী । রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়ার ৫নং ওয়ার্ডে এর অবস্থান। এখানকার পতিতাদের মৃত্যুর পর সৎকার করা হতো না । বলা হতো অপবিত্রতায় ভরা তাদের জীবন। সারাজীবন তারা যে পরিমাণ লাঞ্চনা সহ্য করে, তারচেয়ে আরো কয়েকগুণ বেশি লাঞ্ছনা পায় মৃত্যুর পরে !

পতিতাপল্লীর বাসিন্দা আটাত্তর বছর বয়সী রীনা বেগম জানান, ১৪ বছর বয়সে দালালরা তাকে এখানে বিক্রি করে দেয় । তখন থেকেই দেখে আসছেন এখানকার কোন নারী শিশু মারা গেলে মাটির কলসে মাটি ভড়ে লাশের গলায় বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দেয়া হত । এছাড়াও মোটা অংকের টাকা চাঁদা দাবি করা হত । এদের অনেকে বিভিন্ন যৌন রোগে আক্রান্ত হয়েই মারা যেত। এই পতিতাদের কোনো দাফন কাফন হতো না । পড়া হতোনা জানাজার নামাজ। কোনো কবরস্থানেই তাদেরকে দাফন করতে দেওয়া হতোনা।

সম্প্রতি এই যৌনপল্লীতে জনগণের দরবার নামে একটি কার্যালয়ের উদ্বোধন করেছেন গোয়ালন্দ ঘাট থানার ওসি আশিকুর রহমান। উদ্বোধনের পর থেকেই পল্লীর বাসিন্দাদের দাবির মুখে খুলে দেয়া হয় নিরাপত্তার স্বার্থে বন্ধ রাখা একাধিক প্রবেশ পথের গেট।

জানা যায়, দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে গত তিন মাস আগে পুলিশ ওই যৌনপল্লীর ৬টি প্রবেশ পথের মধ্যে প্রধান পথ খোলা রেখে অন্যান্য প্রবেশ পথ বন্ধ করে দেয়। সেই সাথে যৌনপল্লীতে নজরদারী বাড়াতে স্থাপন করা হয় অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প। এতেকরে নিষিদ্ধ ওই পল্লীতে আগতদের সংখ্যা অনেকটাই কমে যায়। রোজগারে ব্যাপক ভাটা পড়ে যৌনপল্লীর অন্তত ৫ হাজার বাসিন্দার।

এর আগে দৌলতদিয়ায় ডিআইজির আগমনের সময় যৌনকর্মীরা তাদের ওই গেটগুলো বন্ধসহ নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন। এসময় ডিআইজি মহোদয় তাদের কথা শুনে গোয়ালন্দ ঘাট থানা পুলিশকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। জনগণের দরবারে যৌনকর্মীদের বিভিন্ন অসুবিধা ও অভিযোগ গ্রহন করেন ওসি। এখানে অভিযোগ জানাতে আসা শতাধিক যৌনকর্মী জানান, যৌনপল্লীর কয়েকটি প্রবেশ পথ বন্ধ থাকায় তারা মানবেতর দিন কাটাচ্ছিলেন । ওসি আশিকুর রহমানের হস্তক্ষেপে তারা এখন ভাল আছেন । গোয়ালন্দ ঘাট থানার ওসি আশিকুর রহমান জানান, কোন পথ বন্ধ করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সমুচিন না। প্রবেশ পথও খোলা থাকবে, নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা হবে। জনতার দরবারের উদ্বোধন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর হাজার হাজার বাসিন্দাদের প্রতিদিনই কোন না কোন সমস্যা নিয়ে গোয়ালন্দ ঘাট থানায় যেতে হয়। এতে তাদের যেমন অর্থের অপচয় হয়, অপরদিকে সময় নষ্ট হয়।

মুজিব বর্ষের অঙ্গিকার, পুলিশ হবে জনতার এই প্রয়াসকে বাস্তবে রূপ দিতে পুলিশি সেবা জনগণের দ্বোড়গোড়ায় পৌঁছে দিতেই এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।যোগদানের পর থেকেই ৫টি গেইট উন্মুক্ত করেছি ।চাঁদাবাজি বন্ধ করেছি । মাদক বন্ধ করেছি । কেও অন্যায় করলে তাকে শাস্তির আওতায় আনার ব্যবস্থা করেছি । এখানে প্রতিদিন বেলা ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত তিনি নিজে উপস্থিত থেকে বিভিন্ন মামলা, জিডি ও অভিযোগ গ্রহণ করেন।

ওই যৌনপল্লীর একাধিক বাসিন্দা জানান, তাদের সন্তানদের স্কুলে ভর্তি, চিকিৎসা সেবা নিতে গেলে বা কেউ মারা যাওয়ার পর মৃত্যুসনদ নিতে গেলে পরিচয়পত্র সংগ্রহসহ সকল সহযোগীতা করছেন ওসি আশিকুর রহমান। গত ১১ জানুয়ারি গোয়ালন্দ ঘাট থানার ওসি হিসাবে দায়িত্ব গ্রহন করেন ওসি আশিকুর রহমান। এরপর খোঁজ খবর নিয়ে ডিআইজি মহোয়দকে অবহিত করেন তিনি। যৌনপল্লীতে এখন হাঁসি, তামাশা, খুঁনসুটি চলছে হরদম।

যৌনপল্লীর অসহায় নারী সংগঠনের সভাপতি ঝুমুর বেগম বলেন, আগে এখানে অনেক চাঁদাবাজি হত। ৬টি গেট ছিল। ৫টি বন্ধ রাখা হত। পাহাড়াদারদের চাঁদা বা টাকা দিতে হত। ৪০ টাকা নিত তারা। না দিলে নির্যাতন করা হত। এখন চাঁদাবাজি মাদক সবই বন্ধ করেছেন আমাদের সুযোগ্য এই ওসি সাহেব। সকল গেইট উন্মুক্ত করেছেন। আমাদের দাফনের জন্য কবরস্থানের ব্যবস্থা করেছেন।