হাঁসে সাফল্যের হাসি

জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশিত : শনিবার ১৪ নভেম্বর, ২০২০ /

সরকারি বেসরকারি গবেষকদের হিসেবে এ মুহূর্তে দেশে হাঁসের পরিমাণ প্রায় চার কোটি। রোগ বালাইয়ের ঝুঁকি কম থাকার পাশাপাশি খাদ্য খরচ কম বলে এ খাতটিকে সম্ভাবনাময় বলে মনে করছেন তারা। বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় হাঁস চাষ করে এরই মধ্যে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন অনেকেই। তাদের মুখে ফিরেছে হাসির ঝিলিক।

ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব এনিমেল ব্রিডিং অ্যান্ড জেনেটিক্সের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ড. মো. রুহুল আমিন বলছেন গত দু’দশকে কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের বিস্তৃত হাওর এলাকায় হাঁস চাষে নীরব বিপ্লব ঘটেছে।

তিনি জানান, এ বিপ্লবে বড় ভূমিকা রেখেছে বিদেশি জাতের হাঁসগুলো। পাশাপাশি আমরাও দেশের জন্য উপযুক্ত অধিক উৎপাদনশীল হাঁসের জাত উদ্ভাবনের জন্য গবেষণা করছি। সম্প্রতি পিকিং জাতের হাঁসের সঙ্গে নাগেশ্বরী জাতের হাঁসের ক্রস করে নতুন জাতের উদ্ভাবন করেছেন তার একদল সহকর্মী। জাত উন্নয়নের কাজ করছি আমরা। যে জাত বেশি ডিম দিবে কিন্তু রোগ বালাই কম হবে এমন জাত উদ্ভাবনের চেষ্টা চলছে। আগে শুধু দেশি হাঁস ছিল যা বছরে ৪০-৫০টি ডিম দিতে পারতো। কিন্তু এখন অনেক জাত আছে যেগুলো থেকে বছরে দুইশ’র বেশি ডিম পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। আমরা আরো ভালো জাত উদ্ভাবন করতে চাই। সে জন্য কাজ চলছে।

জানা গেছে, হাঁসের ডিম ও গোশত উৎপাদনে খামারিরা যেন বেশি লাভ করতে পারে আবার মানুষও যেন ন্যায্যমূল্যে এগুলো পেতে পারে এজন্য দেশি-বিদেশি জাতের হাঁসের সংকরায়ণ নিয়ে অনেক গবেষণা হচ্ছে নানা পর্যায়ে। সরকারি হিসেবে এখন দেশে হাঁসের খামার আছে প্রায় আট হাজার। তবে নিবন্ধিত খামারের বাইরেও ব্যক্তি উদ্যোগে দেশের নানা জায়গায় গড়ে উঠেছে হাঁসের খামার। তাই সব মিলিয়ে প্রকৃতপক্ষে হাঁসের সংখ্যা বা নিয়মিত তা থেকে কি পরিমাণ ডিম উৎপাদন হয় তা নিরূপণ করা কঠিন।

নেত্রকোনার হাওর এলাকায় প্রায় ত্রিশ হাজার হাঁসের খামার আছে বলে জানিয়েছেন, খামারি মোহাম্মদ ইয়াছিন মিয়া। তিনি বলছেন, হাঁস চাষ লাভজনক কয়েকটি কারণে। এগুলো হলো খাবার খরচ কম ও হাঁসের রোগ বালাই তুলনামূলক কম হয়। হাওরেই চাষ করি তাই আমার জায়গা দরকার হয়না। খাবার হাঁস হাওর থেকেই খেয়ে নেয়। শুধু ৩০ থেকে ৪০ জন লোক রেখেছি ব্যবস্থাপনার জন্য। গড়ে ৮০-৩০০টি ডিম পাই বছরে হাঁসপ্রতি।

ড. মো. রুহুল আমিন বলছেন, হাঁসের ক্ষেত্রে সুবিধা হলো এর জন্য খাবার খরচ খুব একটা হয় না। কারণ হাঁস প্রাকৃতিক উৎস থেকে খাবার সংগ্রহ করে বেশি। দেশে পুকুর আছে এমন অধিকাংশ বাড়িতেই আগে হাঁস পালন করা হতো। এখন পুকুর কমলেও বিদেশি জাতের হাঁস আসায় উৎপাদন বেড়েছে কয়েকগুণ।

ময়মনসিংহেই সরকারি হাঁস প্রজনন খামারের ব্যবস্থাপক সারোয়ার আহমেদ জানান, ভালো জাতের হাঁস আর জলাভূমি থাকলে হাঁস পালনই হতে পারে সবচেয়ে ভালো প্রকল্প। মুরগি বা এ ধরনের অন্য প্রাণীর ক্ষেত্রে খাবার খরচই অনেক লাগে। অথচ হাঁসের ক্ষেত্রে উল্টো। এরা বিস্তীর্ণ হাওর-বাওর, নদ-নদী, খাল-বিল কিংবা পুকুর জলাশয়ে দলবদ্ধভাবে ঘুরতে ও খাবার সংগ্রহ করতে পছন্দ করে। অন্তত ত্রিশ ভাগ খাবার তারা এসব জায়গা থেকে পায়। তাই খাবার খরচ অনেক কম। আর হাঁসের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের খুব একটা দরকারই হয় না।

হাঁস ও হাঁসের জাত: গবেষক ও খামারিরা বলছেন, হাঁস একেবারে প্রাকৃতিক পানি থেকেই মাছ, ঝিনুক, শামুক, পোকামাকড়, জলজ উদ্ভিদ ইত্যাদি খেয়ে থাকে বলে তাদের অন্য খাদ্যের প্রয়োজন খুব কম। আবার পুকুরে হাঁস চাষ করলে সার ও মাছের খাদ্য ছাড়াই মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব।

সাধারণ মানুষের কাছে তিন ধরনের হাঁস সুপরিচিত- পাতিহাঁস, চীনা হাঁস আর রাজহাঁস। দেশের আবহাওয়ায় এসব হাঁস দীর্ঘকাল ধরেই সহজভাবেই লালন পালন করা সম্ভব হচ্ছে। তাছাড়া যেকোনো জায়গাতেই হাঁস চাষ সম্ভব বলে মনে করেন সরকারি হাঁস প্রজনন খামারের ব্যবস্থাপক সারোয়ার আহমেদ।

প্রফেসর ড. মো. রুহুল আমিন জানান, এখন দেশি হাঁসের বাইরে খাকি ক্যাম্পবেল, জিংডিং, ইন্ডিয়ান রানার, পিকিং ও মাসকোভি জাতের হাঁস বেশি দেখা যায়। এরমধ্যে দেশি হাঁস বছরে ৭০-৮০টি ডিম দেয়। কিন্তু উন্নত ব্যবস্থাপনায় এগুলো (দেশি সাদা ও দেশি কালো) বছরে প্রায় ২০০-২০৫টি ডিম দিতে সক্ষম। খাকি ক্যাম্পবেল হলো ডিম উৎপাদনের জন্য। বছরে এ ধরনের একটি হাঁস গড়ে আড়াইশ’ থেকে তিনশ’ ডিম দিতে পারে। জিংডিং ও ইন্ডিয়ান রানারও আড়াইশ’র মতো ডিম দিতে সক্ষম।

আপনার মতামত লিখুন :