ময়মনসিংহশনিবার , ১১ মে ২০১৯

গাজীপুরে প্রতারক তৈরির প্রশিক্ষণ ক্যাম্প!

গৌরীপুর নিউজ
মে ১১, ২০১৯ ১:৩৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ময়মনসিংহের ভালুকার হতদরিদ্র বাবা আনন্দ বর্মণের ছেলে মিঠুন বর্মণ চার বছর হলো এসএসসি পাস করেছেন। আট সদস্যের পরিবার সামলাতে গিয়ে প্রায়ই উপোস থাকতে হয় মিঠুনের বাবা-মাকে। পরিবারের কষ্ট আর সইতে পারছিলেন না মিঠুন। একটি চাকরির সন্ধানে বিভিন্ন স্থানে ধরনা দিতে থাকেন। অবশেষে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে গাজীপুরে ‘লাইফওয়ে’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পান। সেখানে যোগাযোগ করে জানতে পারেন প্রথমে সাড়ে ২২ হাজার টাকা দিয়ে তাকে ‘লাইফওয়ে বাংলাদেশ’-এর সদস্য হতে হবে। বেতন মাসে ১০ হাজার টাকা। তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষে বেতন হবে দ্বিগুণ। কিন্তু মিঠুন পাবেন কোথায় এত টাকা! ছোট বোনের বিয়ের জন্য জমানো টাকা মিঠুনের হাতে তুলে দিলেন বাবা। বোনের বিয়েটাও ভেঙে দিলেন। স্বপ্ন পূরণের প্রত্যাশা বুকে জিইয়ে ভর্তি হলেন ‘লাইফওয়ে’। শুরু হলো প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণ শেষ হতে না হতেই মিঠুন বুঝে গেলেন প্রতারকের ফাঁদে তার পা পড়েছে।

মিঠুনের মতো এভাবে শত শত তরুণ প্রতারণার শিকার হয়েছেন গাজীপুর চৌরাস্তা এলাকার উনিশে টাওয়ারের লাইফওয়ে বাংলাদেশের মাধ্যমে। তাদের প্রতারণার কৌশল হচ্ছে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম)। এ দেশে এমএলএম ব্যবসার কোনো অনুমোদন নেই। অথচ গাজীপুর চৌরাস্তা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে লাইফওয়েসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এমএলএমের নামে প্রতারণামূলক ব্যবসা করছে। দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে বেকার তরুণদের স্বপ্ন পূরণের ইচ্ছাকে পুঁজি করে তারা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। অবশেষে ভয়ঙ্কর এই প্রতারক চক্রের ২০ সদস্যকে বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেফতার করেছেন র‌্যাব-১-এর সদস্যরা। গ্রেফতার হওয়ার পর চক্রের সদস্যরা র‌্যাবের কাছে বর্ণনা করেছে তাদের প্রতারণার নানা কৌশল।

মিঠুন জানান, প্রতারিত হওয়ার পর তার সামনে দুটি পথ খোলা ছিল। একটি আত্মহত্যা, নয় তো প্রতারক হওয়া। দ্বিতীয় পথটিই বেছে নেন তিনি। প্রথম সপ্তাহে জিএম রাব্বী ও মোফাজ্জল হোসেন নামে দুই বন্ধুকে এখানে এনে তিনি প্রতারণা করেছেন। একটি ঘরে আটকে রেখে টাকা আদায় করেছেন। তবে অধিকাংশই প্রতারিত হয়ে এখান থেকে ফিরে যান। যারা ফিরে যেতে পারেন না, তারাই প্রতারক হন।

শামীম হোসেন নামে সাতক্ষীরার এক কলেজছাত্র লাইফওয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। সব হারিয়ে এখন কলা বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন তিনি। ছয় মাস আগে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে লাইফওয়ের সদস্য হন তিনি। ৩০ বছর ধরে আগলে রাখা মায়ের বিয়ের গহনা বিক্রি করে টাকা জোগাড় করেছিলেন। মাকে বলেছিলেন, ‘কষ্টের দিন শেষ হতে চলেছে।’ যখন তিনি জানলেন প্রতারিত হয়েছেন, তখন আর বাড়ি ফিরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। সড়কের পাশে বসে কলা বিক্রির সময় শামীম বলেন, মায়ের গহনা বিক্রির টাকা জোগাড় করতে পারলেই বাড়ি ফিরে যাবেন।

প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে সুবিশাল জায়গা ভাড়া নিয়ে বছরের পর বছর তারা এ প্রতারণা করে আসছিল। র‌্যাব জানিয়েছে, লাইফওয়ের কর্ণধার লুৎফর রহমান শান্ত ও মুকুল গাজী। তাদের গ্রেফতার করা যায়নি। গাজীপুরে শাহীন মিয়া নামে এক প্রভাবশালীর ছত্রছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে এ প্রতারণা চলছে। স্থানীয় এক যুবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে বলেন, শাহীন মিয়া গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১৯নং ওয়ার্ড শ্রমিক লীগের নেতা। মূলত প্রতারণার এই প্রতিষ্ঠানকে তিনিই আগলে রাখছেন।

সদস্য সংগ্রহের পদ্ধতি ও প্রশিক্ষণ :চাকরির কথা বলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসহায় বেকার তরুণদের তারা গাজীপুরে নিয়ে আসে। প্রথমেই তাদের চোখে পড়ে প্রতিষ্ঠানের সামনে লাগানো সাইনবোর্ড। সেখানে লেখা- ‘এখানে কাউকে চাকির প্রদান করা হয় না, পণ্য বিপণনের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের পথ তৈরি করে দেওয়া হয়’। চাকরিপ্রার্থীরা সাইনবোর্ডে লেখা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা জবাবে বলে, ‘এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার লোক আসে চাকরির জন্য। বিড়ম্বনা থেকে বাঁচতে এই সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে।’ এর পরই প্রতিষ্ঠানগুলোর আশপাশে চায়ের দোকানে নিয়ে তাদের দেওয়া হয় ‘মগজ ধোলাই’, সহজে কোটিপতি হওয়ার বিভিন্ন দাওয়াই। এ জন্য প্রথমে প্রতিষ্ঠানের সদস্য হতে হবে সাড়ে ২২ হাজার টাকায়। বিক্রির জন্য দেওয়া হবে একটি টেলিভিশন। সারা জীবনে দু’জন সদস্য করে টেলিভিশন বিক্রি করতে পারলেই আর কিছু করতে হবে না। তখন সহজ-সরল দরিদ্র কিশোর, তরুণ বা যুবকরা ধাঁধায় পড়ে যান। কোটিপতি হওয়ার সহজ দাওয়াই পেয়ে তারা

সদস্য হন। শুরু হয় তাদের প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণের সময় তাদের শেখানো হয়, কীভাবে ভুলিয়ে প্রতিষ্ঠানের সদস্য সংগ্রহ করে কমিশন পাওয়া যায়। চাকরিপ্রার্থীদের মগজ ধোলাই দিতে চৌরাস্তার বিভিন্ন গলির চায়ের দোকানকে বেছে নেয় তারা। সেখানে সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত মগজ ধোলাইয়ের কাজ চলে।

বৃহস্পতিবার র‌্যাবের জালে আটকা পড়ার আগে দু’দিন সরেজমিন ঘুরে এ চিত্র চোখে পড়েছে। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কোট-টাই পরা যুবকরা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা সাধারণ মানুষকে কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে।

র‌্যাব-১-এর পোড়াবাড়ি ক্যাম্পের ইনচার্জ লে. কমান্ডার আব্দুল্লাহ আল-মামুন বলেন, তাদের প্রতারণায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনগণ। তিনি বলেন, র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার ব্যক্তিরা জানিয়েছে, তারা একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক দলের সক্রিয় সদস্য। দীর্ঘদিন ধরে গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় লাইফওয়ে বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড নামে প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে যুবকদের চাকরি দেওয়ার নামে গোপন কক্ষে বন্দি করে রেখে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

ইমেইলঃ news.gouripurnews@gmail.com