বুধবার, ১১ ২০১৯, ০৫:৪৬ অপরাহ্ন

শিরোনামঃ
বাজারে আসছে ৫০ টাকার নতুন নোট নারী সেজে প্রবাসীদের টাকা হাতিয়ে নেন তারা হালুয়াঘাটে মূর্তি ভাঙচুরের ঘটনায় যুবক আটক গৌরীপুরে মিনিম্যারাথন উপলক্ষে শোভাযাত্রা মুজিব বর্ষকে সামনে রেখে গৌরীপুরে র‌্যালি ও গণসাক্ষরতা অভিযান গৌরীপুরে উপজেলা উন্নয়ন বিষয়ক পরামর্শ কর্মশালা দুই বাসের প্রতিযোগিতায় প্রাণ গেল মা-ছেলের একই অনুষ্ঠানে স্ত্রী-শ্যালিকাকে বিয়ে ময়মনসিংহে বাল্যবিয়েকে ‘না’ চার হাজার শিক্ষার্থীর শিশুদের অংশগ্রহণে আবাদ হোক মসজিদ সন্ধ্যায় রংপুর রেঞ্জার্সের মুখোমুখি কুমিল্লা ওয়ারিয়র্স যেভাবে সেরা শিক্ষিকা হলেন শিক্ষককন্যা ফারহানা চিরকুট লিখে অধ্যক্ষের কক্ষে কলেজছাত্রীর আত্মহত্যা ময়মনসিংহে হেরোইন-ইয়াবাসহ গ্রেফতার ৫ ময়মনসিংহে পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহার গৌরীপুরে বিশ্ব মানবাধিকার দিবস উদযাপিত আজ ময়মনসিংহ মুক্ত দিবস ১৬ ডিসেম্বর থেকে ‘জয় বাংলা’ জাতীয় স্লোগান ‘পুলিশের পোশাক’ পরে পাঁচ স্বর্ণের দোকানে ডাকাতি গৌরীপুরে সার্চ হিউম্যান রাইটস সোসাইটির মানবাধিকার দিবস পালন

অতৃপ্ত খুনি

আমি সাধারণত রাতে গোসল করি না। শীতকালে তো প্রশ্নই ওঠে না। আজ করছি, অনেক ধকল সয়েছি সারাদিন। এতদিন মাথার ওপর চেপে বসা বোঝাটা নামল অবশেষে। বলা যায় আজকের দিনটার জন্যই বেঁচে ছিলাম গত দুই বছর। তবে কাজটা ঠিক না বেঠিক ছিল, বুঝতে পারছি না। যেহেতু আমি এ কাজের পেশাদার কেউ নই।

পাক্কা দশ মিনিট ধরে শুয়ে আছি বাথটাবে। নাক পর্যন্ত পানির নিচে। বাথটাব একদিকে হেলে আছে, মনে হয় সে-ও আজ আমার ভার নিতে নারাজ। কেন যেন উঠতে ইচ্ছে করছে না। সুমাইয়ার খুব শখ ছিল বাথটাবের। সবসময় বলতো, আমাদের বাথরুমে কমোড না থাকলেও বাথটাব থাকতে হবে। নাক পর্যন্ত ডুবে থাকব ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কানের পাশে মৃদু শব্দে বাজতে থাকবে রাহাত ফতেহ আলি খানের কোন গান। হঠাৎ মুঠোফোনের শব্দে ভাবনাচ্যুতি। অফিসের পিয়ন সালামের কল। সম্ভবত কক্সবাজারের এয়ার টিকেটের ব্যবস্থা করতে পেরেছে।

বিজয় দিবসের আগে শুক্র-শনি যোগ হয়ে বেশ লম্বা ছুটি এবার। অসম্ভব মানসিক চাপে ছিলাম গত দুই বছর। ভেবেছিলাম আজকের পর সব ঠিক হয়ে যাবে। হল উল্টো। কাজটার পর ধরেছে ভালো না লাগা রোগ। কিছুদিন একা থাকা দরকার। সমুদ্রপাড়ে কয়েকদিন কাটিয়ে আসলে মন্দ হয় না। এতে যদি রোগটারও কোন সুরাহা হয়। হুট করে সালামকে ফোন করে টিকিটের কথা বলে বসলাম। রাতের মধ্যেই ব্যবস্থা করে ফেলেছে ছেলেটা। বেশ করিৎকর্মা লোক। কাল সকালে ফ্লাইট।

কক্সবাজার যাওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল সুমাইয়ার। বারকয়েক যাওয়ার সুযোগ হয়ে হয়েও হয়নি। আমারও সামর্থ ছিল না নিয়ে যাওয়ার। এখন সামর্থ আছে কিন্তু সুমাইয়া নেই। আল্লাহ সব সুখ মানুষকে একসাথে দেন না। দিলে মানুষ নাফরমান হয়ে যায়। আমিও নাফরমানদের তালিকায় কি-না কে জানে? ভালো কোন হুজুরকে সব খুলে বলে জেনে নিতে হবে। অনেকটা খ্রিষ্টানদের কনফেকশনের মত আর কী।

গোসলের পর শরীরটা এখন বেশ ঝরঝরে, সাথে মনও। বসার ঘরে টিভি চলছে। ঘরে ঢুকেই টিভি অন করেছিলাম, আর বন্ধ করা হয়নি। দরকারি একটা খবর দেখানোর কথা, কিন্তু এখনো দেখায়নি। কী আর করা, অপেক্ষা করা লাগবে। বিটিভিতে চলছে এলাচ লেবুর বাম্পার ফলন নিয়ে প্রতিবেদন। এরা পারেও বটে, দেশের মানুষ আগুনে পুড়ছে, রাস্তাঘাটে মরে পড়ে থাকছে, আর ওরা আছে লেবু চাষ নিয়ে। বিটিভি আর মানুষ হলো না।

বাইরে কনকনে ঠান্ডা বাতাস। শরীরটা আর সঙ্গ দিচ্ছে না, বিশ্রাম চায়। ব্যথাও আছে। জ্বর আসে কি-না। কড়া লিকারের এক কাপ চা খাওয়া দরকার। সুমাইয়ারও ভালো মাপের চায়ের নেশা ছিল। রাস্তার পাশে টং দোকানে ছেলেদের মতো চা খেত। লুকিয়ে সিগারেটও খেত কি-না কে জানে? সুযোগ পেলেই কেন যেন সমাজের স্বাভাবিক কৃষ্টির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার স্বভাব ছিল মেয়েটার।

‘ধানমন্ডির এক ভাড়া বাসা থেকে দুই যুবক আর এক যুবতির ক্ষত-বিক্ষত লাশ উদ্ধার। যুবকদ্বয়ের নাম সানি ও রিগেন। যুবতির নাম এলিনা। এরা সবাই রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে। রিগেন বাকি দু’জনকে হত্যা করে আত্মহত্যা করেছে বলে পুলিশের ধারণা। ঘটনার পেছনে প্রেমের বিরোধ না অন্য কিছু জড়িত তা পুলিশ খতিয়ে দেখছে।’ কয়েকটি ব্লার করা ছবি স্ক্রিনে দিয়ে বেশ আয়েশ করে বলছিল সংবাদপাঠিকা। বাহ বাংলাদেশের পুলিশ তো অনেক এগিয়েছে। রাত আটটার ঘটনা বারোটার মধ্যেই অর্ধেক সমাধান। যাক, পুলিশ আমার দেখানো রাস্তাতেই হাঁটছে। এতবড় ক্লু পাওয়ার পর পুলিশ এই কেস নিয়ে আরও মাথা খাটাবে বলে মনে হয় না। রিগেনকে আসামি দেখিয়ে ফাইল ক্লোজ। আমার ঠোঁটের বামপাশটা নিজের অজান্তেই চোখের দিকে ছুটছে।

দুই বছর আগে
কাল সুমাইয়ার সাথে আমার বিয়ে। পারিবারিকভাবে কোন কমিউনিটি সেন্টারে আমাদের বিয়ে হচ্ছে না। ডাক্তারি পড়ুয়া মেয়েকে কোন বাবা-মা বেকার চালচুলোহীন ছেলের হাতে তুলে দেবে, বলেন? মেডিক্যালে ভর্তি হওয়ার পর থেকে একের পর এক বিয়ের প্রস্তাব আসতে থাকে সুমাইয়ার। লম্বা ছিপছিপে শরীরের উপর শ্যামবর্ণের মুখ, আয়তকার চোখ, সাথে কোমর ছাড়ানো চুল যে কোন পুরুষের কাছেই কামনার বস্তু করে তুলেছিল মেয়েটাকে। প্রস্তাব আসা অনিবার্যই ছিল। সুমাইয়াও বেশ কায়দা করে এসব নাকচ করে দেয় একের পর এক।

বলে রাখা ভালো, আমি ছিলাম সুমাইয়ার গৃহশিক্ষক। সুমাইয়াকে পড়াতাম যখন সে ক্লাস নাইনে পড়ে, আর তার একবছর পর শুরু হয় প্রেমের পাঠদান। মাস ছয়েকের মধ্যে অবশ্য সব জেনে যায় সুমাইয়ার পরিবার। ছাঁটাইও করে দেয় আমাকে। তবে আমার ভাগ্য ভালো ছিল সে যাত্রায়, আমার পরিবর্তে আমারই কাছের ছোটভাই সোহাগকে গৃহশিক্ষক রাখে সুমাইয়ার বাবা-মা। ভাগ্য আসলে অনেকটা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। একই জিনিস প্রতিদিন ঘটে, কখনো স্বর্ণ বয়ে আনে, কখনো ছেড়া জুতো। আমার ভাগ্যে অধিকাংশ সময় ছেড়া জুতোই জোটে।

মেডিক্যালের তরুণ লেকচারার সুমাইয়ার প্রেমে অন্ধ। সুমাইয়া যতই বলুক সে অন্য কাউকে পছন্দ করে, লেকচারার বুঝতে নারাজ। সুমাইয়ার পরিবারে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবও করে বসে দিন কয়েকের মধ্যে। সুমাইয়ার বাবা-মা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। যাক, অবশেষে তাদের মেয়েকে আমার মতো লাফাঙ্গার রাহুমুক্ত করতে পারছে। অগত্যা পরিবারের অমতে একাকী বিয়ে ছাড়া কোন গতি ছিল না। কাল সকালে সুমাইয়া ঢাকায় আসবে, সোহাগ আর তার রুমমেট সাক্ষী থাকবে এরকমই আমাদের পরিকল্পনা।

বিয়ে সব মেয়ের কাছেই ছোটবেলা থেকে লালিত স্বপ্ন। সুমাইয়ারও নিশ্চয়ই ছিল। কিন্তু ওই যে বললাম, ভাগ্য নামের ঢেউ সবসময় স্বর্ণ বয়ে আনে না, জুতোও আনে। ভাগ্য সুমাইয়ার জন্য সোনা না আনলেও আমি আনব বলে ঠিক করেছি। টিউশনের জমানো টাকা আর বন্ধুদের থেকে ধার করে চল্লিশ হাজার টাকা দিয়ে সুমাইয়ার জন্য হারের অর্ডার দিয়েছিলাম, কয়েক দিন আগে। আজ হাতে পাওয়ার কথা। সন্ধ্যার টিউশন থেকে আগে বের হয়েও এলিফেন্ট রোডের স্বর্ণকারের দোকানে আসতে আসতে রাত নয়টা। ফোনে ইমার্জেন্সির কথা না বললে এতক্ষণে হয়তো দোকান বন্ধ করে চলে যেত দোকানদার। রাস্তায় অনেক লোকজন, হেঁটেই শাহবাগ চলে যাই। খামোখা রিক্শা ভাড়া দেব কেন? কাল বিয়ে, অযাচিত অনেক খরচ আসবে, অহেতুক সৌখিনতা দেখানোর সময় এটা না। কে জানত, এই ভাবনাই আমার জীবন ওলটপালট করে দেবে।

‘ভাইয়া, মনিপুরপাড়া কোনদিকে?’ আনমনে হাঁটছিলাম, হঠাৎ নারীকণ্ঠ শুনে থমকে দাঁড়ালাম। একটা মেয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকানো। মেয়েটার আপাদমস্তক দেখে পড়ার চেষ্টা করছি। গায়ের রং উজ্জ্বল ফর্সা, ধারালো চিবুক। কিছু ফর্সা মেয়ে আছে আলুথালু মার্কা, কোন সাজে নিজেকে ভালো লাগে সেই জ্ঞান নেই। এ মেয়েটা ওই রকম না, বেশ স্মার্ট তবে কোন কারণে আতঙ্কিত। এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল ভীত হরিণীর মতো। হাত ইশারা করে মনিপুরপাড়া দেখিয়ে দিলাম। দুই কদম এগিয়ে আবার পিছিয়ে এসে মোড়ে দাঁড়িয়ে মেয়েটা। সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। খুব সম্ভবত ঢাকায় প্রথমবার এসেছে, বাড়ি থেকে মা বলে দিয়েছে ঢাকার মানুষের কথা বিশ্বাস করা যাবে না। একবার ভাবলাম চলে যাই, আবার ভাবলাম মেয়েটা একটা রিকশা পাওয়া পর্যন্ত দাঁড়াই। রাস্তায় লোকজন কমে এসেছে, রিকশাও তেমন দেখছি না।

‘ভাই, আমাকে কাইন্ডলি অন্ধকার পথটুকু পার করে দেবেন? একা যেতে ভয় পাচ্ছি।’ কাঁদো কাঁদো গলায় বলল মেয়েটা। এ অবস্থায় না বলাটা কাপুরুষের কাজ। যেহেতু আমি কাপুরুষ নই (একান্ত ব্যক্তিগত ধারণা) তাই মেয়েটার সাথেই রওনা দিলাম।

নষ্ট ল্যাম্পপোস্টের নিচে আসতেই মেয়েটা কী যেন বের করতে লাগল ব্যাগ খুলে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দু’দিক থেকে দুটো ছেলে জাপটে ধরল আমাকে, মুখে কিছু একটা স্প্রে করে মেয়েটা। সম্ভবত ক্লোরফম জাতীয় কিছু।

‘বা…টা প্যান্টের পকেটে চেইন রাখছে, কিপ্টার বাচ্চা। পুরা রাস্তা নিজেও হাঁটছে আমাদেরও হাঁটায়া আনছে।’ উত্তেজিত কণ্ঠে বলছিল মেয়েটা। বেশ সাবলীল কণ্ঠস্বর। এখন আর মেয়েটাকে আতঙ্কগ্রস্ত মনে হচ্ছে না। ছেলে দুটো পকেট হাতড়ে চলছে, সাথে মেয়েটিও। আমার খুব বলতে ইচ্ছে করছে, ভাই মোবাইলটা নেবেন না, কাল আমার বিয়ে। ফোন না থাকলে সুমাইয়া আমাকে পাবে কিভাবে? কিন্তু মুখ দিয়ে কথা বের হয় না।

‘এই এলিনা, আর কিছু আছে বলদটার কাছে?’ জামাকাপড় ছাড়া কিছু নাই বলে উচ্চস্বরে খিলখিল করে হাসতে লাগল মেয়েটা। মেয়েটার নাম তাহলে এলিনা, বাহ বেশ সুন্দর নাম তো। হাসিটাও খুব সুন্দর, সুমাইয়াও এত সুন্দর করে হাসতে জানত না। মেয়েটাকে আরেকবার দেখা দরকার কিন্তু চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার দেখছি। সম্ভবত জ্ঞান হারাচ্ছি।

দুই দিন পর চোখ খুলে দেখি ঢাকা মেডিক্যাল। মাঝে বারকয়েক জ্ঞান ফিরলেও কিছু বোঝার আগেই আবার ঘুম। এক রিকশাওয়ালা এখানে এনে রেখে গেছে দুইদিন আগে, সাথে পরিচয় নিশ্চিত করার মতো কিছু ছিল না। পুলিশি ঝামেলা এড়াতে এক ইন্টার্ন ডাক্তারের পরামর্শে নিজের ছেলে পরিচয়ে ভর্তি করিয়ে যায় রিকশাওয়ালা। অতিমাত্রায় ক্লোরফম ব্যবহারে স্নায়ুতে সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তাই ইঞ্জেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছিল আমাকে।

সুমাইয়ার খোঁজ নেওয়া দরকার। মেয়েটা নিশ্চয়ই আমাকে ভুল বুঝছে, যত দ্রুত সম্ভব তার ভুল ভাঙাতে হবে। সেই ইন্টার্ন ডাক্তারের ফোন থেকে কল করলাম, অপরদিক থেকে ক্রমাগত ক্ষমা চাইছে নারীকণ্ঠ। দুটো নম্বরেরই একই গতি। কু ডাক দিচ্ছে মনে। তাড়াহুড়ো করে গিয়ে হাজির হলাম সোহাগের ব্যাংকে।

‘ভাই, কই ছিলেন এ কয়দিন? কত জায়গায় খুঁজলাম, কোন খবর নাই।’ এক দমে বলল সোহাগ।
‘সে আলাপ পড়ে হবে, আগে বল সুমাইয়া কই?’
‘বসেন ভাই, কিছু খাবেন?’ একটু ভারি মনে হলো সোহাগের গলা। খারাপ কিছু হয় নাই তো, অস্থির লাগছে কেমন যেন।
‘ভাই, সুমাইয়া ঢাকায় আসে নাই, রাতে আপনার ফোন বন্ধ পেয়ে আমাকে ফোন দেয়। আমি রাতে রওনা না দিয়ে সকাল পর্যন্ত ওয়েট করতে বলছিলাম। সকালেও আপনার কোন খোঁজ পাইনি। সুমাইয়া ধরে নেয় আপনি তার সাথে প্রতারণা করেছেন। আপনার নামে সুইসাইড নোট লিখে আত্মহত্যা করেছে সে। তার ফ্যামিলি হন্যে হয়ে খুঁজছে আপনাকে। গা ঢাকা দিয়ে থাকেন কিছুদিন। আমাকেও পুলিশ নজরদারিতে রাখছে। আপাতত আমার সাথেও যোগাযোগ বন্ধ রাখলে ভালো হয় ভাই। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমি আপনাকে জানাব।’ কোন রকমে কান্না চেপে বলছিল সোহাগ।

কোন কথা না বলে ধীর পায়ে বের হয়ে এলাম, যেন পায়ের সাথে দশ মণ ওজনের পাথর বেঁধে দিয়েছে কেউ। আমিও আত্মহত্যা করব বলে ঠিক করলাম। না, সুমাইয়া নেই এ জন্য না। সুমাইয়ার মৃত্যুর দায় নিয়ে আমাকে পালিয়ে বেড়াতে হবে, এটা মেনে নিতে পারছিলাম না।

বাড্ডা লিঙ্ক রোড ধরে হাঁটতে হাঁটতে সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনলাম। যাদের কারণে সুমাইয়া আত্মহত্যা করল, আমি হুলিয়া নিয়ে আধা ফেরারি, তারা আরামে পোলাও কোর্মা খাবে, এটা হতে দেওয়া যায় না। তাদের শেষ দেখে তবেই আমার শান্তি।

মেস পরিবর্তন করলাম এক সপ্তাহের মধ্যেই। পুরনো বন্ধু-বান্ধবের সাথেও যোগাযোগ বন্ধ। প্রায় রাতেই বাটা সিগনালে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, যদি এলিনার দেখা পাওয়া যায়।

বছর দেড়েক পর একরকম অপ্রত্যাশিতভাবেই পেলাম এলিনার দেখা, সেই ফর্সা মুখ, রিনরিনে গলা। অফিসের পর একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকনোম্যাট্রিক্সের ক্লাস নেই কয়েক দিন হলো। এখানেই এলিনাকে দেখলাম। ধারালো চিবুক আর সোনালি চুলে মেয়েটাকে বেশ আবেদনময়ী লাগছে। বারকয়েক মেয়েটার সাথে চোখাচোখি হলো ক্লাসে। এরপর প্রায়ই অযাচিতভাবে কথা বলি এলিনার সাথে। ইচ্ছে করেই মুখে নার্ভাস ভাব রাখি কথা বলার সময়। সুমাইয়া বলেছিল, মেয়েরা নার্ভাস ছেলেদের ঘাঁটাতে পছন্দ করে। মাসখানেকের মধ্যেই কথার সত্যতা পেলাম। একদিন রাতে অপরিচিত নম্বর থেকে কল এলো। রিসিভের পর বুঝলাম, এটা এলিনা। মেয়েটা দ্বিতীয়বারের মতো আমাকে শিকার বানাতে চায়। আমার কপালে মনে হয় বলদ লেখা আছে, নয়ত মেয়েটা বারবার আমাকেই টার্গেট করে কেন?

কিছুদিনের ভেতর বাকি দুই ছেলের দেখাও জুটল। একজনের নাম রিগেন, অপরজন সানি। এরা ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে এখানেই পড়ে। রিগেন এলিনার বয়ফ্রেন্ড আর সানি জাস্ট ফ্রেন্ড। এ তিন জনের একসাথে বসে নেশা করার অভ্যাস আছে। তিনজনই ধনী পরিবারের সন্তান।

কয়েকদিনেই এলিনার সাথে মিষ্টি একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে আমার। মেয়েটার কাছে টানার ক্ষমতা ঈর্ষণীয়। এ কয় দিনের মধ্যেই আমি কাইত। যেমন তেমন কাইত না, একেবারে মরণ কাইত। এ পর্যন্ত পাঁচবার যমুনায় ঘোরাঘুরি করা হয়ে গেছে এলিনাকে নিয়ে। বুঝতে পারছি, মেয়েটা ফাঁদে ফেলছে আমাকে। কিন্তু কেন যেন তার পাতা ফাঁদ খারাপ লাগছে না। তার হাতের অপ্রস্তুত ছোঁয়া কেমন যেন আলোড়ন সৃষ্টি করে শরীরে। ইদানিং এলিনার সাথে কারণে অকারণে রিক্শায় চড়া হয়। তবে দু-দিন ধরে লক্ষ্য করছি, দূর থেকে আমাদের ওপর নজর রাখছে দু’জোড়া চোখ। এরা আর কেউ না, এলিনার দুই বন্ধু রিগেন ও সানি। অর্থাৎ এলিনারা জাল গুটিয়ে আনছে। আমার সামনে অপেক্ষা করছে নতুন কোন বিপদ। ওরা আঘাত হানার আগেই আমাকে আঘাত হানতে হবে।

গত ছয় মাস ধরে রিগেন, সানি আর এলিনার উপর লক্ষ্য রাখছি। বেশ কিছু কাজের তথ্যও পেয়েছি ওদের।
১. সানি ভেতরে ভেতরে এলিনাকে পছন্দ করে।
২. রিগেন আর এলিনার ভেতরে বিষয়টা নিয়ে বেশ ঝগড়া হয়।
৩. ধানমন্ডির একটা বাসায় সানি একা থাকে, এলিনার ঐ বাসায় যাতায়াত আছে।
৪. রিগেন সানির এ বাসা সম্পর্কে কিছু জানে না।
৫. ওদের সবার কাছেই একাধিক ক্লোরফমের বোতল আছে।
৬. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, এলিনা এবার আমাকে ফাঁদে ফেলেনি। সানি রিগেনের অজান্তেই আমার সাথে ঘোরে। কোনভাবে সানি ব্যাপারটা জেনে যায় এবং রিগেনকে দেখায়।

আজ সন্ধ্যা ছয়টা।
সন্ধ্যার দিকে সানির বাসার দারোয়ান বাসা থেকে একটু দুরে দাঁড়িয়ে। সুযোগটা চিনতে আমার ভুল হলো না, ঢুকে সোজা দোতালায়। দুশ’ টাকা দিয়ে বানানো মাস্টার কি দিয়ে অনায়াসে ঢুকে গেলাম তার বাসায়। রুমের সেলফ ভর্তি ক্লোরফমের বোতল। এরা ভাতের বদলে এসব দিয়েই পেট ভরায় নাকি! হাতে গ্লাভস পরে অপেক্ষা করতে লাগলাম সানির আগমনের। রিগেন আর এলিনাকে দেখে এসেছি ধানমন্ডি লেকে। ঘণ্টাখানেক পর সিঁড়িতে সানির পায়ের আওয়াজ শুনতে পেলাম।

‘আসসালামু আলাইকুম, ভাইয়া ভালো আছেন?’ আমার কথা শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল সানি।
‘স্যাআআরর, আপপনি এখানে! কিভাবে?’
‘সারপ্রাইজ…’
সানির হা করা মুখে ক্লোরফম স্প্রে করে দিলাম আর কিছু বলার আগেই। মাত্র এক মিনিট লাগল বেহুশ হতে। সানির অচেতন দেহ চেয়ারের সাথে আর মুখে স্কচটেপ আটকালাম শক্ত করে। এবার আসল কাজ।

‘বেবি, বাসায় চলে আয়, মিস করছি।’ সানির ফোন থেকে মেসেজ করলাম এলিনাকে। মিনিট দশেকের মধ্যে সিঁড়িতে এলিনার পায়ের শব্দ। দরজা খোলাই ছিল।
‘পাগলা, তুই মিস করার আর সময় পাস না, রিগেন কেমন জানিসই তো… লাইট নেভানো কেন রে?’ ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল এলিনা।
‘এলিনা ভালো আছ?’
‘স্যার, আপনি এখানে? সানি কোথায়?’ একেবারে শান্তভাবে বলল মেয়েটা।
অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক থাকার একটা গুণ আছে মনে হয় মেয়েটার। না হলে এ পরিস্থিতিতে একটা মানুষ স্বাভাবিক থাকে কিভাবে!
‘তোমার পারফিউমের নামটা যেন কি? বেশ সুন্দর ঘ্রান… সুমাইয়াও এটা ইউজ করতো…’
‘সুমাইয়া কে? সানি কোথায়? স্যার, আপনার কী হয়েছে?’
এবার সে কিছুটা আতঙ্কিত, সেই প্রথম দিনের মতো। ধীর পায়ে কাছে এলাম এলিনার। মেয়েটা একটুও নড়ছে না। একভাবে আমার দিকে তাকিয়ে। তাকানোর মধ্যে ভালোবাসা আর করুণার মিশেল। এলিনাকেও বেহুশ করে বেঁধে ফেললাম সানির মতো। এবার তাদের জ্ঞান ফেরার অপেক্ষা। এ দু’টোকে মেরে ফাঁসিয়ে দেব রিগেনকে।

আগে জ্ঞান ফিরল সানির। সানির বাসার ফল কাটার চাকু দিয়ে ফালাফালা করে ফেলেছি ওর সারা মুখ। বেচারা মুখে স্কচটেপের কারণে চিৎকারও করতে পারছে না। পাশে জ্ঞান ফিরেছে এলিনার। অবিশ্বাসে ভরা চোখ নিয়ে তাকাচ্ছে একবার সানি আরেকবার আমার দিকে। গলায় ছুড়ি চালানোর পর ধরফর করতে করতে একসময় নিস্তেজ হয়ে গেল সানির দেহ। এবার এলিনার পালা। আজ বড্ড নিষ্পাপ দেখাচ্ছে মেয়েটাকে। সোনালি চুল ঘামে লেপ্টে আছে কপালে। ভেজা চোখ দুটো বড় মায়াকাড়া। আহারে আজকের পর এ চোখজোড়া দুনিয়া দেখবে না। রক্তবর্ণের ঠোঁটজোড়া কিছু বলার জন্য থেকে থেকে কেঁপে উঠছে, কিন্তু শব্দ বের হচ্ছে না। ছেড়ে দিলেও মুশকিল, এই মেয়ে পুলিশের কাছে গিয়ে আমার বিরুদ্ধে নালিশ দেবে। ফাঁসির আগে রিমান্ডেই অর্ধেক জীবন শেষ। নাহ, একে ছাড়া যাবে না। চাকু গলায় দিতে যাব, এমন সময় দরজায় রিগেনের গলা। এলিনা আর সানিকে গালাগাল দিচ্ছে। বেচারা রিগেন যদি জানতো, এ নামে ওর পরিচিত কারো আর অস্তিত্ব নেই। ভাগ্য আজ আমার জন্য সোনা বয়ে এনেছে। দারোয়ান রিগেনকে ঘরে ঢুকতে দেখেছে। উত্তেজিতভাবে দরজা ধাক্কাতে শুনেছে কেউ না কেউ। আমার রাস্তা পরিষ্কার।

এলিনার খেল খতম করে দরজা খুলে দিলাম। একই কৌশলে ক্লোরফম স্প্রে করলাম রিগেনের মুখে। বেহুশ করার পর বোতলের ঢাকনা খুলে পুরোটা ঢেলে দিলাম রিগেনের মুখে। সেলফে থাকা অন্য বোতলগুলোর ঢাকনা খুলে একই কায়দায় ঢাললাম। রিগেনের হাতের স্পর্শ নিয়ে ময়লার ঝুড়িতে ঠাঁই হলো চাকুটার। মিনিট পনেরো ধরে পুরো ঘরে ভালো করে তল্লাশি চালালাম। আমার প্রবেশের কোন চিহ্ন অবশিষ্ট আছে কি-না দেখতে। শেষে বাড়ির পেছনের পানির পাইপ ধরে নেমে দেয়াল টপকে বের হয়ে এলাম। স্কুল জীবনের স্কাউট এভাবে আমার কাজে আসবে কে জানত?

পরদিন কক্সবাজার পৌঁছলাম সকাল ন’টায়। এগারোটার দিকে চোখে সানগ্লাসসমেত ইনানী সৈকতের দিকে হাঁটা ধরলাম। সানগ্লাসটা এলিনা দিয়েছিল গত জন্মদিনে। সেদিনের পর থেকেই আবেগ দূর করে শুরু করি সুমাইয়ার মৃত্যুর প্রতিশোধের প্ল্যান। প্রতিশোধ বরাবরই নিষ্ঠুর। প্রেমের হলে তো কথাই নেই। আচ্ছা, এলিনা কি আমার প্রেমে পড়েছিল? কে জানে হয়তো পড়েছিল, উত্তর জানার তো কোন উপায় রাখিনি। তবে আমি এলিনার প্রতি দুর্বল ছিলাম এতে কোন সন্দেহ নেই। গত রাত থেকে তার ঘামে ভেজা মুখটা বারবার সামনে ভাসছে।

সৈকতে দুটো পরিচিত মুখ। সুমাইয়া আর সোহাগ। সুমাইয়ার ঘাড়ে হাত রেখে জলকেলি করছে সোহাগ। পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল আমার। মাথা ঝিমঝিম করছে, তবে কি এতদিন মিথ্যার জগতে ছিলাম আমি। বারবার চোখের সামনে ভাসতে লাগল এলিনার নিষ্পাপ চেহারাটা। আহা রে, মাত্র চল্লিশ হাজার টাকার জন্য মেয়েটাকে মেরে ফেললাম। সোহাগকে এর শাস্তি পেতেই হবে। আর সুমাইয়া, ভালোবাসার উল্টো পিঠেই ঘৃণার বসবাস। যার ভালোবাসা যত প্রকট, ঘৃণাও তত ভয়ঙ্কর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

ক্যালেন্ডার

SatSunMonTueWedThuFri
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
     12
10111213141516
31      
      1
3031     
      1
16171819202122
       
   1234
12131415161718
19202122232425
262728293031 
       
1234567
891011121314
15161718192021
293031    
       
     12
17181920212223
24252627282930
       
  12345
6789101112
20212223242526
2728293031  
       
2930     
       
    123
45678910
11121314151617
18192021222324
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30      
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031     
   1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031 
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930    
       
    123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930 
       
কপিরাইট © গৌরীপুর নিউজ ডট কম ২০১৯
Design & Developed BY A K Mahfuzur Rahman