ময়মনসিংহশুক্রবার , ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২

রাজকন্যার প্রাণে সোহাগীর জল

রতন ভৌমিক
সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২২ ৬:৪৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

রাজকন্যার নাম ‘সোহাগী’। সেবছর রাজ্যে খরার কারণে প্রজাদের অধিক জলকষ্ট দূর করতে রাজা প্রকান্ড পুকুর খনন করলেন । একমাত্র রাজকন্যার নামানুসারে পুকুরের নাম রাখা হলো সোহাগী ;কিন্তু অধিক খননেও জল উঠলো না।
এমন খবরে বিষণœচিত্তে নিরাশ রাজা বসে রইলেন পুকুরপাড়ে । এসময় রাজা দৈববাণী শুনতে পেলেন। ‘ রাজন তোমার একমাত্র মেয়েকে পুকুরে নামিয়ে দাও,জল ওঠবে ’। অনন্যোপায় হয়ে রাজা প্রজাদের সুখের কথা ভেবে কন্যা সোহাগীকে কোনো এক পূর্ণিমার রাতে পুকুরে নামিয়ে দিলেন। ভীত সোহাগীকে আশ^স্ত করে রাজা বললো ‘তোমার কোনো ভয় নেই মা, পুকুরে জল উঠতে শুরু করলেই তোমাকে আমি উপরে টেনে তুলবো’। রাজকন্যা পুকুরে নামামাত্রই চারদিক থেকে হু হু করে জল উঠে পুকুর ভরে গেলো। রাজা আর মেয়েকে উপরে তুলতে পারল না; অতলে তলিয়ে গেলো রাজকন্যা সোহাগী। প্রজাদের জলকষ্ট চিরতরে দূর হলেও রাজা হারালেন একমাত্র কন্যাকে। অর্থাৎ রাজকন্যার প্রাণের বিনিময়ে মিললো সোহাগীর জল!

এমন জনশ্রæতি কিংবা কল্পকাহিনী হতে উদৃত সোহাগী পুকুরের অবস্থান ময়মনসিংহের ঈশ^রগঞ্জ উপজেলায়। উপজেলা সদর হতে সাত কি.মি.দূরে অবস্থিত সোহাগী পুকুর।
শুধু পুকুর নয়,রাজকন্যার নাম সোহাগী নামানুসারেই নামকরণ করা হয়েছে রেলওয়ে স্টেশন, স্থানীয় বাজার, ইউনিয়ন, প্রাথমিক, উচ্চবিদ্যালয় ও মাদ্রাসার নাম।
সরেজমিন স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, কয়েকশ বছর পূর্বে রাজা-জমিদারদের আমলে প্রজাদের জলকষ্ট দূর করতে প্রায় ছয় একর জায়গায় সুবিশাল পুকুরটি খনন করা হয়েছিলো। বর্তমানে ব্যক্তি মালিকানার আওতায় পুকুরটিতে বাণজ্যিকভাবে মাছ চাষ করা হচ্ছে।

তবে উক্ত কল্পকাহিনী কিংবা জনশ্রæতির বিকাশ ঘটে জননন্দিত প্রয়াত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের এক উপন্যাসে সোহাগী পুকুরের বর্ণনায়। তাঁর ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত ‘আমার আছে জল’ উপন্যাসের প্রথম অংশে বর্ণিত আছে সোহাগী পুকুরের ইতিহাস। তারপর থেকেই এতদঞ্চলের মানুষ তথা সাহিত্যপ্রেমীদের আলোচনায় যুক্ত হয় সোহাগী পুকুরের প্রসঙ্গটি। স্থানীয় সাহিত্যপ্রেমীদের অনেকেই জানান, হুমায়ূন আহমেদের বাড়ি পাশর্^বর্তী কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে। যাত্রাপথে সোহাগী রেলস্টেশনের নামে মুগ্ধ হয়ে এ নামের ইতিবৃত্ত খুঁজতে গিয়ে সোহাগী পুকুরের অস্তিত্বের সন্ধান পান তিনি।
এখনো ঐতিহ্যের টানে সোহাগী বাজার সংলগ্ন সুবিশাল পুকুরটি অবলোকন করতে পুকুরপড়ে প্রায়ই ছুটে যান বিনোদনপ্রেমী মানুষ।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কবি শফিক মৈমনসিংহী (৭০) বলেন, রাজকন্যার প্রাণের বিনিময়ে সোহাগী পুকুরে জল উঠার বিষয়টি কল্পকাহিনী কিংবা জনশ্রæতি যাই হোক না কেন ঈশ^রগঞ্জে সোহাগী পুকুরের অস্তিত্ব বা অবস্থান সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই। আর একথা সত্য যে, কয়েকশ বছর পূর্বে আঠারবাড়ির জমিদারের উদ্যোগে সোহাগী পুকুর খনন করা হয়েছিলো। তবে সোহাগী পুকুরের বিষয়টি দীর্ঘকাল পরে আলোচনায় আসে প্রয়াত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের লেখনিতে। আমরা যেভাবেই বলি না কেন ‘সোহাগী পুকুর’ ঈশ^রগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে জানান তিনি ।

    ইমেইলঃ news.gouripurnews@gmail.com